+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

আর্থ্রাইটিস (Arthritis) রোগের ধরন কি কি

আর্থ্রাইটিস (Arthritis) কোনো একক রোগ নয়, বরং এটি ১০০ টিরও বেশি রোগের একটি সমষ্টি, যা জয়েন্ট বা গাঁটকে প্রভাবিত করে। এটি জয়েন্টের প্রদাহ, ব্যথা, ফোলাভাব এবং শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ সৃষ্টি করে। আর্থ্রাইটিসের ধরন ও কারণের উপর ভিত্তি করে এর চিকিৎসা পদ্ধতিও ভিন্ন হয়। আর্থ্রাইটিসের প্রধান কয়েকটি ধরন বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:


১. অস্টিও আর্থারাইটিস (Osteoarthritis - OA)

এটি আর্থ্রাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ ধরন। এটিকে "ক্ষয়-জনিত বাত" বা "Wear and Tear" আর্থ্রাইটিসও বলা হয়।

কারণ: বয়সের সাথে সাথে বা জয়েন্টের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে হাড়ের সংযোগস্থলের কার্টিলেজ (তরুণাস্থি) ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। এই কার্টিলেজ হাড়ের মধ্যে কুশন বা শকের শোষক হিসেবে কাজ করে। কার্টিলেজ ক্ষয় হয়ে গেলে হাড়গুলো একে অপরের সাথে ঘষা খায়, যার ফলে ব্যথা, ফোলা এবং জয়েন্ট শক্ত হয়ে যায়।

সাধারণত আক্রান্ত স্থান: সাধারণত হাঁটু, কোমর, হাত, ঘাড় এবং মেরুদণ্ডের নিচের অংশ বেশি আক্রান্ত হয়।

লক্ষণ:

(ক) জয়েন্টে ব্যথা, বিশেষ করে নড়াচড়ার সময়।

(খ) সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বা দীর্ঘ সময় বিশ্রাম নেওয়ার পর জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া (সাধারণত ৩০ মিনিটের কম সময় স্থায়ী হয়)।

(গ) জয়েন্ট নড়াচড়া করার সময় ঘষা বা ক্র্যাঞ্চিং শব্দ শোনা।

(ঘ) জয়েন্টের নমনীয়তা কমে যাওয়া।

(চ) ক্লান্তি: কিছু ধরণের আর্থ্রাইটিসে (যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস) রোগী অতিরিক্ত ক্লান্ত বোধ করতে পারেন।

(ছ) ক্ষুধা কমে যাওয়া ও ওজন হ্রাস: বিশেষ করে প্রদাহজনিত আর্থ্রাইটিসে এই লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে।

(জ) অন্যান্য শরীরের অংশে প্রভাব: কিছু ধরণের আর্থ্রাইটিস জয়েন্ট ছাড়াও শরীরের অন্যান্য অঙ্গ যেমন চোখ, ত্বক, ফুসফুস, কিডনি ইত্যাদি প্রভাবিত করতে পারে।

ঝুঁকির কারণ:বয়স বৃদ্ধি, স্থূলতা, পূর্বের জয়েন্টে আঘাত এবং জেনেটিক কারণ।

২. রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (Rheumatoid Arthritis - RA)

এটি একটি অটোইমিউন রোগ।

কারণ: এই রোগে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজের জয়েন্টের সুস্থ কোষগুলোকে আক্রমণ করে। এর ফলে জয়েন্টের আস্তরণে (সাইনোভিয়াম) প্রদাহ হয়, যা থেকে ব্যথা, ফোলা এবং জয়েন্টের ক্ষতি হতে পারে।

সাধারণত আক্রান্ত স্থান: সাধারণত হাতের আঙ্গুল, কব্জি, এবং পায়ের আঙ্গুলের ছোট ছোট জয়েন্টগুলোকে প্রভাবিত করে। এটি সাধারণত শরীরের উভয় দিকে একই সাথে ঘটে (যেমন, উভয় হাতের কব্জি বা উভয় হাঁটু)।

লক্ষণ:

(ক) জয়েন্টে তীব্র ব্যথা, ফোলা এবং গরম অনুভূত হওয়া।

(খ) সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দীর্ঘ সময় (৩০ মিনিটের বেশি) জয়েন্ট শক্ত হয়ে থাকা।

(গ) ক্লান্তি, জ্বর এবং ওজন কমে যাওয়া।

(ঘ) প্রায়শই শরীরের অন্যান্য অংশেও প্রভাব ফেলতে পারে, যেমন চোখ, ফুসফুস এবং রক্তনালী।

৩. গাউট (Gout)

একে বাংলায় "গেঁটে বাত" বলা হয়।

কারণ: রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে গেলে তা জয়েন্টের মধ্যে তীক্ষ্ণ স্ফটিক আকারে জমা হয়। এর ফলে জয়েন্টে তীব্র প্রদাহ ও ব্যথা হয়।

সাধারণত আক্রান্ত স্থান: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পায়ের বড় আঙুলের গোড়ার জয়েন্টকে প্রভাবিত করে। তবে এটি গোড়ালি, হাঁটু এবং কব্জিকেও আক্রান্ত করতে পারে।

লক্ষণ:

(ক) আক্রান্ত জয়েন্টে হঠাৎ করে তীব্র ব্যথা, যা মাঝরাতে বা ভোরের দিকে শুরু হয়।

(খ) জয়েন্ট অত্যন্ত গরম, লাল এবং ফুলে যায়।

(ঘ) আক্রান্ত স্থানে অসহনীয় স্পর্শকাতরতা।

(ঙ) জ্বর এবং ক্লান্তি।

৪. সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস (Psoriatic Arthritis)

এটি এক ধরনের প্রদাহজনিত আর্থ্রাইটিস যা সোরিয়াসিস (Psoriasis) নামক ত্বকের রোগের সাথে সম্পর্কিত।

কারণ: এটিও একটি অটোইমিউন রোগ। সোরিয়াসিস আক্রান্ত প্রায় ৩০% মানুষের মধ্যে এই ধরনের আর্থ্রাইটিস দেখা যেতে পারে।

সাধারণত আক্রান্ত স্থান: সাধারণত আঙ্গুল, পায়ের আঙ্গুল, মেরুদণ্ড এবং অন্যান্য জয়েন্টকে প্রভাবিত করে।

লক্ষণ:

(ক) জয়েন্টে ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া এবং ফোলা।

(খ) আঙ্গুল ও পায়ের আঙ্গুলগুলো "সসেজ-এর মতো" ফুলে যাওয়া।

(গ) ত্বকে সোরিয়াসিসের ফুসকুড়ি বা লালচে আঁশ দেখা যাওয়া।

(ঘ) নখের পরিবর্তন, যেমন নখে গর্ত হওয়া বা নখ বিছানা থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া।

৫. অ্যানকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস (Ankylosing Spondylitis)

এটি মেরুদণ্ডকে প্রভাবিত করে এমন একটি প্রদাহজনিত রোগ।

কারণ: এটিও একটি অটোইমিউন রোগ, যা সাধারণত মেরুদণ্ডের কশেরুকার মধ্যে প্রদাহ সৃষ্টি করে।

সাধারণত আক্রান্ত স্থান: মেরুদণ্ড এবং মেরুদণ্ডের নিচের অংশ (কোমর)।

লক্ষণ:

(ক) দীর্ঘস্থায়ী কোমর ব্যথা ও শক্ত হয়ে যাওয়া, যা সাধারণত সকালে এবং বিশ্রামের পর বেড়ে যায়।

(খ) মেরুদণ্ডের নমনীয়তা কমে যাওয়া।

(গ) পিঠের উপরের অংশে ব্যথা।

(ঘ) প্রদাহ দীর্ঘস্থায়ী হলে মেরুদণ্ডের কশেরুকাগুলো এক হয়ে যেতে পারে, যার ফলে মেরুদণ্ড শক্ত ও বাঁকা হয়ে যায়।

৬. জুভেনাইল আর্থ্রাইটিস (Juvenile Arthritis)

১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে যে কোনো ধরনের আর্থ্রাইটিস হলে তাকে জুভেনাইল আর্থ্রাইটিস বলা হয়।

কারণ:এটিও একটি অটোইমিউন রোগ।

সাধারণত আক্রান্ত স্থান: সাধারণত হাঁটু, গোড়ালি, কব্জি, চোয়াল, ঘাড় এবং কাঁধকে প্রভাবিত করে।

লক্ষণ: জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা, শক্ত হয়ে যাওয়া, জ্বর, লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া এবং ত্বকে ফুসকুড়ি।
আর্থ্রাইটিসের সঠিক ধরন নির্ণয় এবং চিকিৎসা শুরু করার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।