গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল স্ট্রোমাল টিউমার (Gastrointestinal Stromal Tumors - GISTs) হলো এক ধরনের বিরল টিউমার যা পরিপাকতন্ত্রের (হজমতন্ত্র) প্রাচীরের বিশেষ কোষ থেকে উৎপন্ন হয়। এই কোষগুলোকে ক্যাজালের ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ (Interstitial Cells of Cajal - ICCs) বলা হয়। ICCs হলো এক ধরনের বিশেষ কোষ যা পরিপাকতন্ত্রের পেশীগুলোর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে এবং খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে।
যখন এই ICCs কোষগুলোর ডিএনএতে পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটে, তখন তারা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করে এবং টিউমার তৈরি করে। বেশিরভাগ GISTs-ই KIT বা PDGFRA নামক জিনের মিউটেশনের কারণে হয়। এই টিউমারগুলো ক্যানসারযুক্ত (ম্যালিগন্যান্ট) বা ক্যানসারবিহীন (বিনাইন) উভয়ই হতে পারে, তবে GISTs-এর ক্ষেত্রে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে এবং এদের সম্ভাব্য ম্যালিগন্যান্ট টিউমার হিসাবেই ধরা হয়, এমনকি ছোট আকারের হলেও।
GISTs শরীরের যেকোনো গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্টের অংশে হতে পারে, তবে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়:
(ক) পাকস্থলী (Stomach): প্রায় ৬০-৭০% GISTs পাকস্থলীতে হয়।
(খ) ক্ষুদ্রান্ত্র (Small Intestine): প্রায় ২০-২৫% GISTs ক্ষুদ্রান্ত্রে দেখা যায়।
(গ) বৃহদান্ত্র (Large Intestine/Colon and Rectum): খাদ্যনালী (Esophagus)
এবং অ্যাপেন্ডিক্স-এও GISTs হতে পারে, তবে তা বিরল। কিছু ক্ষেত্রে পরিপাকতন্ত্রের বাইরেও (যেমন - ওমেন্টাম বা
মেসেন্টারিতে) GISTs দেখা যেতে পারে, যাকে এক্সট্রাগ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল GISTs বলা হয়।
GISTs এর লক্ষণগুলো টিউমারের আকার, অবস্থান এবং এটি ছড়িয়েছে কিনা তার উপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। অনেক সময় ছোট GISTs-এ কোনো লক্ষণই দেখা যায় না এবং অন্য কোনো রোগের পরীক্ষার সময় ঘটনাক্রমে ধরা পড়ে।
সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
(ক) পেটে ব্যথা বা অস্বস্তি: পেটে হালকা থেকে তীব্র ব্যথা হতে পারে।
(খ) রক্তক্ষরণ (Bleeding): এটি GISTs এর একটি সাধারণ লক্ষণ। টিউমার থেকে রক্তপাত
হলে মলের সাথে রক্ত যেতে পারে (কালো বা আঠালো মল) অথবা বমির সাথে রক্ত আসতে পারে। এর ফলে রক্তশূন্যতা
(Anemia) হতে পারে, যার কারণে ক্লান্তি এবং দুর্বলতা দেখা দেয়।
(গ) বমি বমি ভাব ও বমি: বিশেষ করে যদি টিউমারটি পাচনতন্ত্রে বাধার সৃষ্টি করে।
(ঘ) দ্রুত পেট ভরা লাগা (Early Satiety): অল্প পরিমাণে খাবার খাওয়ার পরই পেট ভরে
গেছে মনে হওয়া, বিশেষ করে যদি টিউমার পাকস্থলীতে থাকে।
(ঙ) অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস: কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া।
(চ) পেটে পিণ্ড বা ফোলাভাব: পেটে একটি চাকা বা ভর অনুভব হতে পারে।
(ছ) অন্ত্রের বাধা (Bowel Obstruction): বড় টিউমার অন্ত্রের পথ বন্ধ করে দিতে পারে,
যার ফলে তীব্র ব্যথা, বমি এবং পেট ফুলে যেতে পারে।
GISTs নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়:
শারীরিক পরীক্ষা: ডাক্তার পেটে কোনো অস্বাভাবিক পিণ্ড বা ফোলা আছে কিনা তা পরীক্ষা করবেন।
(ক) সিটি স্ক্যান (CT Scan): টিউমারের আকার, অবস্থান এবং
শরীরের অন্যান্য অংশে (যেমন লিভার বা পেরিটোনিয়ামে) ছড়িয়েছে কিনা তা দেখতে সাহায্য করে।
(খ) এমআরআই (MRI): আরও বিস্তারিত ছবি প্রদান করতে পারে।
(গ) পিইটি স্ক্যান (PET Scan): টিউমারের কার্যকলাপ এবং শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়েছে কিনা তা দেখতে সহায়ক।
(ঘ) এন্ডোস্কোপি/কলোনোস্কোপি: পাচনতন্ত্রের ভেতরের অংশ দেখতে এবং টিউমার থাকলে তার থেকে বায়োপসি (টিস্যুর
নমুনা সংগ্রহ) নিতে ব্যবহার করা হয়।
(ঙ) এন্ডোস্কোপিক আল্ট্রাসাউন্ড (EUS): এন্ডোস্কোপের সাথে আল্ট্রাসাউন্ড প্রোব ব্যবহার করে টিউমারের সঠিক অবস্থান
এবং গভীরতা দেখা যায় এবং বায়োপসি নেওয়া যেতে পারে।
(চ) বায়োপসি: টিউমারের একটি ছোট অংশ কেটে নিয়ে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করা হয় GISTs কোষ আছে কিনা
তা নিশ্চিত করার জন্য। এর সাথে জেনেটিক টেস্টিং (KIT বা PDGFRA মিউটেশন পরীক্ষা) করা হয় যা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে গুরুত্বপূর্ণ।
GISTs-এর চিকিৎসা টিউমারের আকার, অবস্থান, এটি ছড়িয়েছে কিনা, এবং এটি কোন জেনেটিক মিউটেশনের কারণে হয়েছে তার উপর নির্ভর করে।
(ক) সার্জারি (অস্ত্রোপচার): যদি টিউমারটি ছোট হয় এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে না থাকে,
তাহলে সার্জারিই সাধারণত প্রথম এবং সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার এবং এর চারপাশে কিছু সুস্থ টিস্যু সরিয়ে ফেলা হয়।
(খ) লক্ষ্যযুক্ত থেরাপি (Targeted Therapy): GISTs-এর চিকিৎসার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এই ওষুধগুলো
ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট অস্বাভাবিকতাগুলোকে লক্ষ্য করে কাজ করে, বিশেষ করে KIT বা PDGFRA জিনের মিউটেশন। ইমাটিনিব (Imatinib) হলো
সবচেয়ে প্রচলিত টার্গেটেড থেরাপির ওষুধ, যা টিউমারের বৃদ্ধি ধীর করতে বা সঙ্কুচিত করতে সাহায্য করে। সার্জারির আগে (টিউমার ছোট করার জন্য)
বা পরে (পুনরাবৃত্তি রোধ করতে) এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। যদি ইমাটিনিবে প্রতিক্রিয়া না দেখায়, তাহলে সুনিতিনিব (Sunitinib) বা রেগোর্যাফেনিব
(Regorafenib) এর মতো অন্যান্য ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।
(গ) কেমোথেরাপি (Chemotherapy) এবং রেডিয়েশন থেরাপি (Radiation Therapy): GISTs সাধারণত প্রচলিত কেমোথেরাপি
বা রেডিয়েশন থেরাপিতে ভালোভাবে সাড়া দেয় না। তবে কিছু বিরল ক্ষেত্রে বা অন্যান্য চিকিৎসা কার্যকর না হলে এগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে। GISTs
একটি জটিল রোগ, এবং এর চিকিৎসার জন্য গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সার্জন, অনকোলজিস্ট এবং প্যাথলজিস্টদের একটি সমন্বিত দল প্রয়োজন। যদি GISTs
এর কোনো লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।