ক্যান্সার নির্ণয় এবং চিকিৎসার পরিকল্পনা করার জন্য এর বৈশিষ্ট্য ও পর্যায় বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ক্যান্সারের ধরন জানলেই হয় না, বরং ক্যান্সার কোষগুলো কতটা অস্বাভাবিক এবং সেগুলো শরীরে কতটা ছড়িয়ে পড়েছে, সেটাও জানা জরুরি। এই দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গ্রেডিং (Grading) এবং স্টেজিং (Staging)।
গ্রেডিং হলো ক্যান্সার কোষগুলো স্বাভাবিক কোষ থেকে কতটা আলাদা দেখায় এবং তারা কতটা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে, তার একটি পরিমাপ। প্যাথলজিস্টরা মাইক্রোস্কোপের নিচে টিউমারের একটি টিস্যু নমুনা পরীক্ষা করে গ্রেড নির্ধারণ করেন। গ্রেডিং সাধারণত G1 থেকে G4 পর্যন্ত হতে পারে, তবে কিছু ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ভিন্ন গ্রেডিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়।
(১) কোষের অস্বাভাবিকতা: গ্রেডিং দেখে বোঝা যায়
ক্যান্সার কোষগুলো স্বাভাবিক কোষের সাথে কতটা মিল রাখে। যত বেশি অস্বাভাবিক, তত বেশি উচ্চ গ্রেড।
(২) বৃদ্ধির হার: উচ্চ গ্রেডের ক্যান্সার কোষগুলো সাধারণত দ্রুত বিভাজিত হয় এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখায়।
(৩) চিকিৎসা পরিকল্পনা: গ্রেডিংয়ের উপর ভিত্তি করে ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নেন কোন ধরনের চিকিৎসা সবচেয়ে কার্যকর
হবে এবং কতটা আক্রমণাত্মক চিকিৎসার প্রয়োজন।
(১) গ্রেড 1 (G1 - নিম্ন গ্রেড/ভালভাবে ডিফারেন্সিয়েটেড):
এই ক্যান্সার কোষগুলো স্বাভাবিক কোষের মতো দেখতে এবং ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। এদের আগ্রাসী হওয়ার সম্ভাবনা কম।
(২) গ্রেড 2 (G2 - মধ্যবর্তী গ্রেড/মাঝারিভাবে ডিফারেন্সিয়েটেড): এই কোষগুলো স্বাভাবিক
কোষের চেয়ে কিছুটা অস্বাভাবিক দেখায় এবং তুলনামূলকভাবে মাঝারি গতিতে বৃদ্ধি পায়।
(৩) গ্রেড 3 (G3 - উচ্চ গ্রেড/দুর্বলভাবে ডিফারেন্সিয়েটেড): এই কোষগুলো স্বাভাবিক কোষ
থেকে খুবই অস্বাভাবিক দেখায় এবং দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এদের ছড়ানোর প্রবণতা বেশি।
(৪) গ্রেড 4 (G4 - আনডিফারেন্সিয়েটেড): এই কোষগুলো এতটাই অস্বাভাবিক যে তাদের
উৎপত্তি কোন ধরনের স্বাভাবিক কোষ থেকে হয়েছে, তা নির্ধারণ করা কঠিন। এরা অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং খুবই
আক্রমণাত্মক হয়। কিছু ক্যান্সারের ক্ষেত্রে গ্রেডিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট স্কেল ব্যবহার করা হয়, যেমন প্রোস্টেট ক্যান্সারের
জন্য গ্লিসন স্কোর (Gleason Score) এবং স্তন ক্যান্সারের জন্য এলস্টন-এলিস গ্রেড (Elston-Ellis Grade)।
১. T (Tumor): প্রাথমিক টিউমারের আকার এবং এটি কাছাকাছি টিস্যুতে কতটা ছড়িয়েছে।
(ক) Tis: ক্যান্সার ইন সিটু (Cancer in situ), অর্থাৎ ক্যান্সার কোষগুলো শুধু উপরের স্তরে রয়েছে এবং ছড়ায়নি।
(খ) T0: প্রাথমিক টিউমারের কোনো প্রমাণ নেই।
(গ) T1, T2, T3, T4: টিউমারের আকার বা স্থানীয় বিস্তারের উপর ভিত্তি করে নম্বর দেওয়া হয়। যত বেশি নম্বর,
টিউমার তত বড় বা তত বেশি স্থানীয়ভাবে ছড়িয়েছে।
২. N (Nodes): ক্যান্সার কাছাকাছি লিম্ফ নোডগুলোতে ছড়িয়েছে কিনা এবং কতটা ছড়িয়েছে।
(ক) N0: কাছাকাছি লিম্ফ নোডগুলোতে ক্যান্সার ছড়ায়নি।
(খ) N1, N2, N3: লিম্ফ নোডের সংখ্যা এবং অবস্থান অনুযায়ী নম্বর দেওয়া হয়। যত বেশি নম্বর, তত বেশি লিম্ফ নোড আক্রান্ত।
৩. M (Metastasis): ক্যান্সার শরীরের দূরবর্তী অঙ্গে (যেমন ফুসফুস, লিভার, হাড়, মস্তিষ্ক) ছড়িয়েছে কিনা।
(ক) M0: দূরবর্তী মেটাস্ট্যাসিস নেই (ক্যান্সার দূরবর্তী অঙ্গে ছড়ায়নি)।
(খ) M1: দূরবর্তী মেটাস্ট্যাসিস আছে (ক্যান্সার দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়েছে)।
(১) পর্যায় I (Stage I): এই পর্যায়ে ক্যান্সার একটি ছোট
এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে এবং সাধারণত কাছাকাছি লিম্ফ নোড বা দূরবর্তী অঙ্গে ছড়ায়নি। এই পর্যায়ে চিকিৎসার মাধ্যমে
নিরাময়ের সম্ভাবনা বেশি থাকে।
(২) পর্যায় II (Stage II): ক্যান্সার কিছুটা বড় হয়েছে বা কাছাকাছি টিস্যুতে ছড়িয়েছে,
তবে দূরবর্তী অঙ্গে ছড়ায়নি। কিছু ক্ষেত্রে কাছাকাছি লিম্ফ নোডেও ছড়িয়ে থাকতে পারে।
(৩) পর্যায় III (Stage III): ক্যান্সার উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হয়েছে এবং কাছাকাছি লিম্ফ
নোডগুলোতে ছড়িয়েছে, তবে দূরবর্তী অঙ্গে ছড়ায়নি।
(৪) পর্যায় IV (Stage IV - মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সার): এটি ক্যান্সারের সবচেয়ে উন্নত পর্যায়,
যেখানে ক্যান্সার দূরবর্তী অঙ্গ বা টিস্যুতে (যেমন ফুসফুস, লিভার, হাড় বা মস্তিষ্ক) ছড়িয়ে পড়েছে। এই পর্যায়কে
মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারও বলা হয়। এই পর্যায়ে ক্যান্সার নিরাময় কঠিন হলেও, চিকিৎসা জীবনকাল বাড়াতে এবং
লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
(১) চিকিৎসার পরিকল্পনা: স্টেজিংয়ের উপর ভিত্তি করে
ডাক্তাররা রোগীর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন, যা সার্জারি, রেডিয়েশন, কেমোথেরাপি,
টার্গেটেড থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপি হতে পারে।
(২) পূর্বাভাস: এটি রোগীর জীবনকাল এবং নিরাময়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়।
(৩) গবেষণা ও ট্রায়াল: ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতে রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য স্টেজিং
একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। গ্রেডিং এবং স্টেজিং উভয়ই ক্যান্সারের সম্পূর্ণ চিত্র বুঝতে সাহায্য করে এবং ডাক্তারদের
রোগীদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর এবং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করতে সহায়তা করে। এই তথ্যগুলো
রোগীদেরও তাদের রোগ এবং এর সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে ধারণা দিতে সাহায্য করে।