ক্যান্সার মানবজাতির প্রাচীনতম রোগগুলির মধ্যে একটি এবং এর ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন থেকে শুরু করে আধুনিক জিনোম সিকোয়েন্সিং পর্যন্ত, ক্যান্সারের ধারণা, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা পদ্ধতির বিবর্তন ঘটেছে দীর্ঘ সময় ধরে।
(ক) প্রাচীন ফসিল ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ: বিজ্ঞানীরা প্রাগৈতিহাসিক যুগের ডাইনোসরের ফসিল এবং প্রাচীন মানুষের দেহাবশেষে টিউমারের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন। প্রায় ৩০০০০ বছর আগের নিয়ান্ডারথালদের দেহাবশেষেও হাড়ের টিউমারের প্রমাণ মিলেছে।
(খ) মিশরীয় সভ্যতা (প্রায় ১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ): এডউইন স্মিথ প্যাপিরাস (Edwin Smith Papyrus) হলো ক্যান্সারের প্রাচীনতম লিখিত দলিলগুলির মধ্যে একটি। এটি প্রায় ১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি মিশরীয় চিকিৎসা পাঠ্য, যা মূলত পূর্ববর্তী প্রায় ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি পাঠ্যের অনুলিপি। এই প্যাপিরাসে আটটি স্তন টিউমারের কেস বর্ণনা করা হয়েছে, যা শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে অপসারণের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে, পাঠ্যটিতে বলা হয়েছে যে "এই রোগের কোনো প্রতিকার নেই" (There is no treatment)। এটি ইঙ্গিত দেয় যে প্রাচীন মিশরীয়রা ক্যান্সারের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। এছাড়া, প্রাচীন মিশরীয় মমিতে হাড়ের ক্যান্সারের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
(গ) প্রাচীন গ্রীস (প্রায় ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ): হিপোক্রেটিস (Hippocrates), যাকে "আধুনিক চিকিৎসার জনক" বলা হয়, তিনিই প্রথম "কার্সিনোস" (carcinos) শব্দটি ব্যবহার করেন ক্যান্সার বোঝাতে। গ্রীক ভাষায় "কার্সিনোস" মানে কাঁকড়া। হিপোক্রেটিস টিউমারের শিরাগুলোর সাথে কাঁকড়ার পায়ের সাদৃশ্য দেখে এই নামটি দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, ক্যান্সার হলো শরীরের চারটি প্রধান তরল (রক্ত, কফ, হলুদ পিত্ত, কালো পিত্ত) - যাকে হিউমার (humors) বলা হতো - এর ভারসাম্যের অভাবে, বিশেষ করে কালো পিত্তের আধিক্যের কারণে সৃষ্ট রোগ। তার মতে, কালো পিত্ত জমা হয়ে টিউমার তৈরি করে।
উদাহরণ: অস্টিওসার্কোমা (হাড়ের ক্যান্সার), লাইপোসার্কোমা (চর্বির ক্যান্সার), রাবডোমায়োসার্কোমা (পেশীর ক্যান্সার) ইত্যাদি।
লিউকেমিয়া হলো রক্ত কোষের ক্যান্সার। এটি সাধারণত অস্থি মজ্জা (bone marrow) থেকে শুরু হয়, যেখানে নতুন রক্ত কোষ তৈরি হয়। লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হলে অস্বাভাবিক শ্বেত রক্তকণিকা তৈরি হয়, যা রক্তের স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে ব্যাহত করে।
(ঘ) রোমান সাম্রাজ্য: রোমান চিকিৎসক সেলসাস (Celsus) (প্রথম শতক খ্রিস্টাব্দ) গ্রীক ভাষার "কার্সিনোস" শব্দটিকে ল্যাটিন ভাষায় "ক্যান্সার" (cancer) হিসেবে অনুবাদ করেন, যা আজও ব্যবহৃত হয়। তিনি ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে সার্জারি করার পরামর্শ দেন, কিন্তু উন্নত ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এর বিরোধিতা করেন। রোমান সার্জন গ্যালেন (Galen) (দ্বিতীয় শতক খ্রিস্টাব্দ) হিপোক্রেটিসের হিউমার তত্ত্বকে সমর্থন করেন এবং বিশ্বাস করতেন যে ক্যান্সার সার্জারির মাধ্যমে অপসারণ করা উচিত নয়, কারণ এতে কালো পিত্ত আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তার প্রভাবের কারণে প্রায় এক হাজার বছর ধরে ক্যান্সারের সার্জারি কমে যায়।
(ক) অন্ধকার যুগ: গ্যালেনের প্রভাব এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে মধ্যযুগে ক্যান্সারের চিকিৎসা তেমন এগোয়নি। ক্যান্সারের কারণ হিসেবে প্রায়শই অতিপ্রাকৃত বা দৈব শক্তিকে দায়ী করা হতো।
(খ) আর্লি মডার্ন পিরিয়ড: রেনেসাঁস যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন আগ্রহ জন্মায়। ১৬শ শতকে, ভেসালিয়াস (Vesalius) এবং মর্গ্যাগনি (Morgagni) এর মতো অ্যানাটোমিস্টরা মানবদেহের ব্যবচ্ছেদ করে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন সম্পর্কে আরও জানতে শুরু করেন। তারা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অস্বাভাবিকতা এবং রোগের স্থানীয়ীকরণের উপর জোর দেন।
(গ) ১৭শ এবং ১৮শ শতক: এই সময়ে কিছু বিজ্ঞানী হিউমার তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করা শুরু করেন এবং ক্যান্সারের স্থানীয় উৎপত্তি সম্পর্কে ধারণা দিতে শুরু করেন।
(ঘ) পারসিভাল পট (Percivall Pott) (১৭৭৫): একজন
ইংরেজ সার্জন। তিনি লক্ষ্য করেন যে চিমনি সুইপারদের মধ্যে স্ক্রোটাল ক্যান্সারের হার অনেক বেশি। তিনি এই
রোগের সাথে চিমনির কালি এবং দূষণের যোগসূত্র স্থাপন করেন, যা ছিল পরিবেশগত কার্সিনোজেন (ক্যান্সার
সৃষ্টিকারী উপাদান) চিহ্নিত করার প্রথম প্রমাণগুলির মধ্যে একটি। এটি দেখিয়েছিল যে ক্যান্সার শুধু শরীরের
ভেতরের ভারসাম্যহীনতা নয়, বরং বাহ্যিক কারণ দ্বারাও প্রভাবিত হতে পারে।
মাইক্রোস্কোপের ব্যবহার
বাড়তে থাকে, যা ক্যান্সার কোষের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ শুরু করতে সাহায্য করে।
(ক) কোষ তত্ত্বের বিকাশ: ১৯শ শতকে রুডলফ ভার্চো (Rudolf Virchow) এর মতো বিজ্ঞানীরা কোষ তত্ত্বের বিকাশ ঘটান, যা বলে যে সমস্ত জীবন্ত জিনিস কোষ দ্বারা গঠিত এবং নতুন কোষ বিদ্যমান কোষ থেকে আসে। এটি ক্যান্সারকে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হিসাবে বুঝতে সাহায্য করে।
(খ) সার্জারির পুনরুত্থান: অ্যানাটমি এবং জীবাণু তত্ত্বের (Germ Theory) অগ্রগতির সাথে সার্জারি ক্যান্সারের চিকিৎসায় আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এনেস্থেশিয়া এবং অ্যান্টিসেপটিক পদ্ধতির উন্নতির ফলে সার্জনরা নিরাপদে ক্যান্সার টিউমার অপসারণ করতে সক্ষম হন।
(গ) উইলিয়াম স্টুয়ার্ট হ্যালস্টেড (William Stewart Halsted): ১৯শ শতকের শেষের দিকে এবং ২০শ শতকের শুরুর দিকে হ্যালস্টেড মাস্টেক্টমি (radical mastectomy) পদ্ধতির প্রবর্তন করেন স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য। এই পদ্ধতিতে টিউমারের পাশাপাশি স্তনের প্রচুর পার্শ্ববর্তী টিস্যু, পেশী এবং লিম্ফ নোড অপসারণ করা হতো। যদিও এটি পরবর্তীতে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক বলে প্রমাণিত হয়, এটি ক্যান্সারের সার্জারির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক ছিল।
(ঘ) প্রথম কেমোথেরাপির চেষ্টা: যদিও এর কার্যকারিতা সীমিত ছিল, কিছু রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে ক্যান্সারের চিকিৎসা করার প্রাথমিক চেষ্টা শুরু হয়।
উপরে উল্লিখিত প্রধান প্রকারগুলো ছাড়াও আরও কিছু বিরল ধরণের ক্যান্সার আছে, যেমন:
২০শ শতক ক্যান্সারের গবেষণা এবং চিকিৎসায় অভূতপূর্ব বিপ্লব নিয়ে আসে।
(ক) রেডিয়েশন থেরাপির আবিষ্কার (১৯০০ এর দশক): মেরি কুরি এবং পিয়ের কুরি তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের পর, বিজ্ঞানীরা উপলব্ধি করেন যে বিকিরণ ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে পারে। ১৯০০ এর দশকের প্রথম দিকে রেডিয়েশন থেরাপি ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
(খ) কেমোথেরাপির বিকাশ (১৯৪০ এর দশক): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সালফার মাস্টার্ড নামক একটি রাসায়নিক পদার্থের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করার সময় বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন যে এটি অস্থি মজ্জার কোষগুলোকে দমন করতে পারে। এই পর্যবেক্ষণের ফলে ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য প্রথম কেমোথেরাপির ওষুধ তৈরি হয়। পরবর্তীতে ১৯৫0 এবং ১৯৬০ এর দশকে আরও অনেক কেমোথেরাপির ওষুধ আবিষ্কৃত হয়।
(গ) হরমোন থেরাপি (১৯৭০ এর দশক): বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে কিছু ক্যান্সার (যেমন স্তন ক্যান্সার এবং প্রোস্টেট ক্যান্সার) হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হয়। এটি হরমোন থেরাপির বিকাশের পথ খুলে দেয়, যেখানে হরমোনের মাত্রা পরিবর্তন করে বা হরমোনের প্রভাব ব্লক করে ক্যান্সারের চিকিৎসা করা হয়।
(ঘ) ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা: বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্র এবং ইনস্টিটিউট (যেমন NCI - National Cancer Institute in USA) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ক্যান্সারের কারণ, প্রতিরোধ, নির্ণয় এবং চিকিৎসার গবেষণায় বিশাল অবদান রাখে।
(ঙ) জিন তত্ত্বের অগ্রগতি: ডিএনএ গঠন আবিষ্কার এবং জেনেটিক্সের অগ্রগতির ফলে ক্যান্সারের আণবিক ভিত্তি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জিত হয়। অনকোজিন (oncogenes) এবং টিউমার সাপ্রেসর জিন (tumor suppressor genes) আবিষ্কার ক্যান্সারের বিকাশে জিনের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে।
২১শ শতকে ক্যান্সারের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, বিশেষ করে জেনোমিক্স এবং ইমিউনোলজির ক্ষেত্রে অগ্রগতির কারণে।
(ক) টার্গেটেড থেরাপি (Targeted Therapy): ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে, বিজ্ঞানীরা এমন ওষুধ তৈরি করতে শুরু করেন যা ক্যান্সার কোষের নির্দিষ্ট আণবিক পথ বা প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে, যখন সুস্থ কোষগুলোকে কম প্রভাবিত করে। উদাহরণস্বরূপ, ইমাটিনিব (Gleevec) ক্রনিক মায়েলয়েড লিউকেমিয়া (CML) এবং জিআইএসটি (GIST) এর চিকিৎসায় একটি বিপ্লবী পরিবর্তন এনেছে।
(খ) ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy): এই চিকিৎসায় রোগীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে ক্যান্সার কোষকে চিনতে এবং ধ্বংস করতে উৎসাহিত করা হয়। চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর (checkpoint inhibitors) এর মতো ওষুধগুলো বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসায় অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে।
(গ) জেনোমিক্স এবং পার্সোনালাইজড মেডিসিন (Genomics and Personalized Medicine): ক্যান্সার রোগীর টিউমারের জেনেটিক মেকআপ বিশ্লেষণ করে তাদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত এবং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা পদ্ধতি নির্বাচন করা হচ্ছে।
(ঘ) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং বিগ ডেটা: এই প্রযুক্তিগুলি ক্যান্সারের গবেষণা, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
(ঙ) ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতা: স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম (যেমন ম্যামোগ্রাম, প্যাপ স্মিয়ার, কলোনোস্কোপি) এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন (যেমন ধূমপান ত্যাগ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম) ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ক্যান্সার রোগের ইতিহাস হলো মানবজাতির বিজ্ঞান, গবেষণা এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি চলমান কাহিনী। প্রতি দশকে নতুন আবিষ্কার এবং প্রযুক্তি আমাদের এই জটিল রোগকে আরও ভালোভাবে বুঝতে এবং এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করছে।