ক্যান্সারের যত ধরনের প্রকরণ আছে, তার মধ্যে কার্সিনোমা (Carcinoma) সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এটি এমন এক ধরনের ক্যান্সার যা আমাদের শরীরের আবরণী কলা (epithelial tissue) বা এপিথেলিয়াম (Epithelium) থেকে তৈরি হয়। এই আবরণী কলা শরীরের ভেতরের এবং বাইরের পৃষ্ঠকে ঢেকে রাখে, বিভিন্ন অঙ্গের লাইন তৈরি করে এবং গ্রন্থি টিস্যু (glandular tissue) গঠন করে। এই কোষগুলোই আমাদের ত্বক, পরিপাকতন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র, মূত্রতন্ত্র এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গের বাইরের বা ভেতরের আস্তরণ তৈরি করে।
আমাদের শরীর মূলত চার ধরনের টিস্যু বা কলা দিয়ে গঠিত: আবরণী কলা
(epithelial), যোজক কলা (connective), পেশী কলা (muscle) এবং স্নায়ু কলা (nervous)। এর মধ্যে
আবরণী কলা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি শরীরের প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর হিসেবে কাজ করে,
ক্ষতিকারক পদার্থ থেকে রক্ষা করে, পুষ্টি শোষণ করে এবং বর্জ্য পদার্থ নির্গত করে। আবরণী কলা কোষগুলো
ঘনভাবে সংযুক্ত থাকে এবং সাধারণত একটি ভিত্তি ঝিল্লি (basement membrane) এর উপরে সাজানো থাকে।
এই কোষগুলো বিভিন্ন আকৃতির হতে পারে,
যেমন:
১. স্কোয়ামাস (Squamous): চ্যাপ্টা, পাতলা কোষ,
যা ত্বক এবং ফুসফুসের মতো স্থানে পাওয়া যায়।
২. কিউবয়ডাল (Cuboidal): ঘনক্ষেত্রাকার কোষ, যা কিডনি এবং গ্রন্থিতে থাকে।
৩. কলামনার (Columnar): লম্বাটে স্তম্ভাকার কোষ, যা পরিপাকতন্ত্রে থাকে।
৪. ট্রানজিশনাল (Transitional): পরিবর্তনশীল আকৃতির কোষ, যা মূত্রথলিতে থাকে।
কার্সিনোমা তখন ঘটে যখন আবরণী কলার কোষগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং স্বাভাবিক কোষের মতো কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এই অস্বাভাবিক কোষগুলো একত্রিত হয়ে একটি টিউমার বা পিণ্ড তৈরি করতে পারে। যদি এই টিউমার ক্ষতিকারক হয়, তবে তাকে ম্যালিগন্যান্ট (malignant) বা ক্যান্সার বলা হয়। এই ম্যালিগন্যান্ট কোষগুলো আশেপাশের সুস্থ টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং রক্ত বা লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের মাধ্যমে শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে যেতে পারে, যাকে মেটাস্ট্যাসিস (metastasis) বলে।
কার্সিনোমা কোষের ধরণ এবং এটি শরীরের কোন অঙ্গকে প্রভাবিত করছে তার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। কিছু সাধারণ প্রকার নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. অ্যাডেনোকার্সিনোমা (Adenocarcinoma): এটি শ্লেষ্মা বা অন্যান্য তরল উৎপাদনকারী গ্রন্থি কোষ থেকে উদ্ভূত হয়। শরীরের প্রায় সব গ্রন্থি বা গ্রন্থিযুক্ত অঙ্গ, যেমন: স্তন, প্রোস্টেট, ফুসফুস (অধিকাংশ ক্ষেত্রে), কোলন, অগ্ন্যাশয়, পাকস্থলী এবং খাদ্যনালীতে এই ধরণের ক্যান্সার দেখা যায়।
২. বেসাল সেল কার্সিনোমা (Basal Cell Carcinoma - BCC): এটি ত্বকের সবচেয়ে সাধারণ ধরনের ক্যান্সার এবং সাধারণত ত্বকের বাইরের স্তরের বেসাল কোষ থেকে শুরু হয়। এটি সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির সংস্পর্শে আসার কারণে হয়ে থাকে এবং সাধারণত ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।
৩. স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা (Squamous Cell Carcinoma - SCC): এটিও ত্বকের একটি সাধারণ ক্যান্সার, যা ত্বকের বাইরের স্তরের স্কোয়ামাস কোষ থেকে শুরু হয়। সূর্যের এক্সপোজার ছাড়াও, মুখ, গলা, খাদ্যনালী এবং ফুসফুসেও এই ধরণের ক্যান্সার হতে পারে।
৪. ট্রানজিশনাল সেল কার্সিনোমা (Transitional Cell Carcinoma - TCC): এই ধরণের ক্যান্সার মূত্রতন্ত্রের (বিশেষ করে মূত্রাশয়, মূত্রনালী, কিডনির পেলভিস) আবরণী কোষ থেকে উদ্ভূত হয়, কারণ এই কোষগুলো প্রস্রাবের আয়তন অনুযায়ী নিজেদের আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে।
৫. রেনাল সেল কার্সিনোমা (Renal Cell Carcinoma - RCC): এটি কিডনির মধ্যে পাওয়া টিউমারের সবচেয়ে সাধারণ প্রকার।
কার্সিনোমা হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ প্রায়শই অজানা থাকে, তবে কিছু ঝুঁকির কারণ এটিকে প্রভাবিত করতে পারে:
(ক) সূর্যের অতিরিক্ত এক্সপোজার: ত্বকের কার্সিনোমার জন্য এটি একটি প্রধান কারণ।
(খ) তামাক সেবন: ফুসফুস, গলা, মুখ এবং অন্যান্য অঙ্গের কার্সিনোমার ঝুঁকি বাড়ায়।
(গ) অ্যালকোহল সেবন: মুখ, গলা এবং যকৃতের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
(ঘ) ভাইরাল সংক্রমণ: যেমন হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV) সার্ভিকাল ক্যান্সার এবং কিছু স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার কারণ হতে পারে।
(ঙ) বয়স: বয়স বাড়ার সাথে সাথে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।
(চ) জিনগত কারণ: কিছু মানুষের জন্মগতভাবে ক্যান্সারের প্রবণতা বেশি থাকে।
(জ) স্থূলতা: এটি বিভিন্ন ধরণের কার্সিনোমার ঝুঁকি বাড়ায়।
(চ) রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ: কিছু রাসায়নিক পদার্থ ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।
কার্সিনোমার চিকিৎসা সাধারণত এর ধরন, পর্যায় এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে। সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো:
(ক) সার্জারি (Surgery): টিউমার অপসারণের জন্য।
(খ) রেডিয়েশন থেরাপি (Radiation Therapy): উচ্চ-শক্তির রশ্মি ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা।
(গ) কেমোথেরাপি (Chemotherapy): ক্যান্সার কোষকে মেরে ফেলার জন্য ওষুধ ব্যবহার করা।
(ঘ) টার্গেটেড থেরাপি (Targeted Therapy): নির্দিষ্ট জিন বা প্রোটিনকে লক্ষ্য করে ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি বন্ধ করা।
(ঙ) ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy): রোগীর নিজের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই
করতে উৎসাহিত করা। কার্সিনোমা একটি মারাত্মক রোগ হলেও, প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত হলে এবং সঠিক চিকিৎসা
পেলে এর নিরাময়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।