মাইয়েলোমা (Myeloma) হলো এক ধরণের ক্যান্সার যা আমাদের অস্থি মজ্জায় (bone marrow) উৎপন্ন হয় এবং প্লাজমা কোষকে (plasma cells) প্রভাবিত করে। প্লাজমা কোষ হলো এক ধরণের শ্বেত রক্তকণিকা (white blood cells), যা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের প্রধান কাজ হলো সংক্রমণ ও রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অ্যান্টিবডি (antibodies) বা ইমিউনোগ্লোবুলিন (immunoglobulins) তৈরি করা।
প্লাজমা কোষগুলো বি-লিম্ফোসাইট (B-lymphocytes) নামক শ্বেত রক্তকণিকা থেকে তৈরি হয়। যখন শরীর কোনো নতুন সংক্রমণ বা বহিরাগত আক্রমণকারী (যেমন ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া) শনাক্ত করে, তখন বি-লিম্ফোসাইটগুলো প্লাজমা কোষে রূপান্তরিত হয় এবং নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি করতে শুরু করে। এই অ্যান্টিবডিগুলো রোগ সৃষ্টিকারী এজেন্টদের চিহ্নিত করে এবং তাদের ধ্বংস করতে সাহায্য করে। প্লাজমা কোষগুলো মূলত অস্থি মজ্জায় বাস করে, যা আমাদের হাড়ের ভেতরের নরম টিস্যু। এখানেই নতুন রক্ত কোষ তৈরি হয়।
মাইয়েলোমা তখন ঘটে যখন অস্থি মজ্জায় একটি অস্বাভাবিক প্লাজমা কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং অনেকগুলো অভিন্ন (ক্লোনাল) অস্বাভাবিক প্লাজমা কোষ তৈরি করে। এই অস্বাভাবিক প্লাজমা কোষগুলোকে মাইয়েলোমা কোষ (myeloma cells) বলা হয়। এই মাইয়েলোমা কোষগুলো সুস্থ প্লাজমা কোষের মতো সঠিক অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে না। পরিবর্তে, তারা এক ধরণের অস্বাভাবিক এবং অকার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যাকে মনোক্লোনাল প্রোটিন (monoclonal protein) বা এম প্রোটিন (M-protein) বলা হয়। এই এম প্রোটিন রক্ত বা প্রস্রাবে জমা হতে পারে এবং বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। সাধারণত, মাইয়েলোমা কোষগুলো অস্থি মজ্জায় জমা হয় এবং নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো সৃষ্টি করে:
(১) হাড়ের ক্ষতি: মাইয়েলোমা কোষগুলো হাড়কে দুর্বল করে দেয়, যার ফলে হাড় সহজে ভেঙে যেতে পারে এবং তীব্র ব্যথা হয়। এক্স-রেতে হাড়ে ছোট ছোট গর্তের মতো দেখা যেতে পারে, যাকে লাইটিক ক্ষত (lytic lesions) বলে।
(২) রক্ত কোষের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া: অস্থি মজ্জায় মাইয়েলোমা কোষের অত্যধিক বৃদ্ধির কারণে সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা এবং অনুচক্রিকার উৎপাদন কমে যায়। এর ফলে রক্তস্বল্পতা (anemia), সংক্রমণ এবং রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ে।
(৩) কিডনি সমস্যা: এম প্রোটিন কিডনিতে জমা হয়ে কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে, যা কিডনি ফেইলিওর পর্যন্ত গড়াতে পারে।
(৪) উচ্চ ক্যালসিয়াম: হাড়ের ক্ষতির কারণে রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, যা ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে। মাইয়েলোমাকে প্রায়শই মাল্টিপল মাইয়েলোমা (Multiple Myeloma) বলা হয়, কারণ এটি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং অস্থি মজ্জার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
যদিও মাল্টিপল মাইয়েলোমা সবচেয়ে সাধারণ, এর কিছু উপ-প্রকার বা সম্পর্কিত অবস্থা রয়েছে:
(১) স্মোল্ডারিং মাইয়েলোমা (Smoldering Myeloma): এটি মাল্টিপল মাইয়েলোমার একটি প্রাথমিক পর্যায়, যেখানে রক্তে এম প্রোটিন থাকে এবং অস্থি মজ্জায় অস্বাভাবিক প্লাজমা কোষ থাকে, কিন্তু রোগীরা এখনও কোনো লক্ষণ অনুভব করেন না এবং হাড় বা কিডনির কোনো ক্ষতি হয়নি। এই অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়, তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
(২) মনোক্লোনাল গ্যামোপ্যাথি অব আনডিটারমাইন্ড সিগনিফিকেন্স (Monoclonal Gammopathy of Undetermined Significance - MGUS): এটি মাইয়েলোমার সবচেয়ে হালকা রূপ, যেখানে রক্তে অল্প পরিমাণে এম প্রোটিন থাকে কিন্তু প্লাজমা কোষের সংখ্যা খুবই কম এবং কোনো লক্ষণ থাকে না। MGUS খুব কমই ক্যান্সারে রূপান্তরিত হয়, তবে এটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।
(৩) প্লাজমা সেলোমা (Plasmacytoma): এটি এক ধরণের মাইয়েলোমা যেখানে ক্যান্সার কোষগুলো একটি নির্দিষ্ট স্থানে একটি একক টিউমার তৈরি করে, যা হাড়ে বা নরম টিস্যুতে হতে পারে। এটি মাল্টিপল মাইয়েলোমার মতো পুরো অস্থি মজ্জায় ছড়িয়ে পড়ে না।
মাইয়েলোমার সুনির্দিষ্ট কারণ অজানা, তবে কিছু ঝুঁকির কারণ এটিকে প্রভাবিত করতে পারে:
(১) বয়স: মাইয়েলোমা সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, বিশেষ
করে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে।
(২) লিঙ্গ: পুরুষদের মধ্যে মাইয়েলোমা হওয়ার প্রবণতা সামান্য বেশি।
(৩) জাতি: আফ্রিকান আমেরিকানদের মধ্যে মাইয়েলোমার ঝুঁকি বেশি।
(৪) পারিবারিক ইতিহাস: যদি পরিবারের কোনো সদস্যের মাইয়েলোমা থাকে, তবে ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে।
(৫) স্থূলতা: অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা মাইয়েলোমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
(৬) অন্যান্য প্লাজমা সেল ডিসঅর্ডার: MGUS বা স্মোল্ডারিং মাইয়েলোমা থাকলে পরবর্তীতে মাল্টিপল মাইয়েলোমা হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
(৭) রাসায়নিকের সংস্পর্শ: কিছু পেশা (যেমন পেট্রোলিয়াম বা কৃষি খাতে) কিছু রাসায়নিক পদার্থের
সংস্পর্শে আসার কারণে ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মাইয়েলোমার লক্ষণগুলো রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট নাও হতে পারে, কিন্তু রোগ বাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দেয়। প্রধান লক্ষণগুলো প্রায়শই CRAB সংক্ষেপণ দিয়ে মনে রাখা হয়:
(১) Calcium (উচ্চ ক্যালসিয়াম): রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বৃদ্ধি পায়,
যার ফলে তৃষ্ণা, ক্লান্তি, দুর্বলতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, বমি বমি ভাব, এবং মানসিক বিভ্রান্তি হতে পারে।
(২) Renal failure (কিডনি ফেইলিওর): কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস পায়, যা দুর্বলতা, ফুলে যাওয়া এবং
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ সৃষ্টি করে।
(৩) Anemia (রক্তস্বল্পতা): লোহিত রক্তকণিকার অভাবে ক্লান্তি, দুর্বলতা, ফ্যাকাশে ত্বক এবং শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
(৪) Bone lesions (হাড়ের ক্ষত) and pain (ব্যথা): হাড় দুর্বল হয়ে যায়, যার ফলে পিঠে ব্যথা,
হাড় ভাঙা এবং হাড়ের ক্ষত দেখা যায়।
অন্যান্য লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:
(৫) ঘন ঘন সংক্রমণ (স্বাভাবিক অ্যান্টিবডির অভাবে)
(৬) স্নায়ুর ক্ষতি (পিঠে ব্যথার কারণে স্নায়ুর ওপর চাপ পড়লে)
(৭) অনিচ্ছাকৃত ওজন হ্রাস
মাইয়েলোমার চিকিৎসা রোগ নির্ণয়ের সময় রোগীর অবস্থা, রোগের পর্যায় এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে। যেহেতু মাইয়েলোমা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিরাময়যোগ্য নয়, তাই চিকিৎসার লক্ষ্য হলো রোগ নিয়ন্ত্রণ করা, উপসর্গ কমানো এবং রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো:
(১) কেমোথেরাপি (Chemotherapy): ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার
জন্য শক্তিশালী ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
(২) টার্গেটেড থেরাপি (Targeted Therapy): নির্দিষ্ট ঔষধ যা মাইয়েলোমা কোষের বৃদ্ধি ও
বিভাজনকে ব্যাহত করে, যেমন প্রোটিওসোম ইনহিবিটরস (proteasome inhibitors) এবং
ইমিউনোমডুলেটরি ড্রাগস (immunomodulatory drugs)।
(৩) ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy): রোগীর নিজের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে মাইয়েলোমা
কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উদ্দীপিত করা।
(৪) স্টেম সেল প্রতিস্থাপন (Stem Cell Transplant): উচ্চ মাত্রার কেমোথেরাপির পরে সুস্থ
স্টেম সেল দিয়ে অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপন করা হয়, যা রোগের দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। এটি সাধারণত
অল্পবয়সী এবং সুস্থ রোগীদের জন্য বিবেচিত হয়।
(৫) বিকিরণ থেরাপি (Radiation Therapy): নির্দিষ্ট স্থানে হাড়ের ব্যথা কমানো বা টিউমারকে
ছোট করার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
(৬) সহায়ক থেরাপি (Supportive Therapy): হাড়ের ক্ষয় কমানোর জন্য বিসফসফোনেটস
(bisphosphonates), ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্য ওষুধ এবং সংক্রমণের চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।
মাইয়েলোমা একটি জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং রোগ হলেও, আধুনিক চিকিৎসার অগ্রগতির কারণে রোগীদের জীবনকাল এবং
জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। রোগের প্রাথমিক সনাক্তকরণ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে
একটি সমন্বিত চিকিৎসা পরিকল্পনা এর ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।