আমাদের শরীর এবং এর কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণের জন্য সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম (Central Nervous System - CNS) অপরিহার্য। এই সিস্টেমে রয়েছে মস্তিষ্ক (brain) এবং মেরুদণ্ড (spinal cord)। সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম ক্যান্সার বলতে সেইসব ক্যান্সারকে বোঝায় যা মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডের টিস্যু থেকে উৎপন্ন হয়। এই ক্যান্সারগুলো মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারিতা (যেমন চিন্তা, স্মৃতি, আবেগ, চলাচল) এবং মেরুদণ্ডের কার্যকারিতা (যেমন শরীরের বিভিন্ন অংশে সংকেত পরিবহন) কে প্রভাবিত করতে পারে, যা গুরুতর শারীরিক ও স্নায়বিক সমস্যা সৃষ্টি করে।
সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম হলো আমাদের শরীরের প্রধান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। এটি দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত:
১. মস্তিষ্ক (Brain): খুলির ভেতরে অবস্থিত এই জটিল অঙ্গটি শরীরের সমস্ত ফাংশন নিয়ন্ত্রণ করে, যার মধ্যে রয়েছে চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি, ভাষা, নড়াচড়া, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হৃৎপিণ্ডের কার্যকলাপ। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
২. মেরুদণ্ড (Spinal Cord): এটি মস্তিষ্কের নিচে মেরুদণ্ডের হাড় (vertebrae) দ্বারা সুরক্ষিত একটি লম্বা, দড়ির মতো কাঠামো। মেরুদণ্ড মস্তিষ্কের সাথে শরীরের বাকি অংশের মধ্যে স্নায়বিক সংকেত পরিবহন করে। মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের চারপাশ মেনিনজেস (meninges) নামক তিনটি ঝিল্লি স্তর দ্বারা আবৃত থাকে এবং সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (cerebrospinal fluid - CSF) দ্বারা বেষ্টিত থাকে, যা এদেরকে রক্ষা করে।
সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের ক্যান্সারগুলো মস্তিষ্কের বা মেরুদণ্ডের বিভিন্ন ধরণের কোষ থেকে উৎপন্ন হতে পারে। এই কোষগুলো যখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং স্বাভাবিক কোষের মতো আচরণ করা বন্ধ করে দেয়, তখন টিউমার তৈরি হয়। এই টিউমারগুলো বেনাইন (benign) বা ম্যালিগন্যান্ট (malignant) হতে পারে।
(ক) বেনাইন টিউমার (Benign Tumors): এগুলি ক্যান্সারবিহীন টিউমার যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণত আশেপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে না। তবে, মস্তিষ্কের মতো সীমিত স্থানে বড় আকারের বেনাইন টিউমারও চাপ সৃষ্টি করে গুরুতর লক্ষণ সৃষ্টি করতে পারে। কিছু বেনাইন টিউমার ম্যালিগন্যান্টে রূপান্তরিত হতে পারে।
(খ) ম্যালিগন্যান্ট টিউমার (Malignant Tumors): এগুলি ক্যান্সারযুক্ত টিউমার যা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং আশেপাশের সুস্থ টিস্যুতে আক্রমণ করতে পারে। মস্তিষ্কের ক্যান্সার সাধারণত শরীরের অন্য অংশে ছড়ায় না (মেটাস্ট্যাসিস), তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি মেরুদণ্ডের সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইডের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
১. প্রাথমিক সিএনএস ক্যান্সার (Primary CNS Cancers): এই ক্যান্সারগুলো সরাসরি মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডের কোষ থেকে উৎপন্ন হয়।
২. সেকেন্ডারি সিএনএস ক্যান্সার বা মেটাস্ট্যাটিক ব্রেন ক্যান্সার (Secondary CNS Cancers / Metastatic Brain Cancer): এই ধরণের ক্যান্সার শরীরের অন্য কোথাও (যেমন ফুসফুস, স্তন, কিডনি, কোলন বা ত্বক) থেকে শুরু হয়ে রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্কে বা মেরুদণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে। সেকেন্ডারি ব্রেন ক্যান্সার প্রাথমিক ব্রেন ক্যান্সারের চেয়ে বেশি সাধারণ।
প্রাথমিক সিএনএস ক্যান্সারের অনেক প্রকার রয়েছে, যা কোষের ধরন এবং উৎপত্তি স্থানের উপর নির্ভর করে। কিছু সাধারণ প্রকার নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. গ্লিওমা (Glioma): এটি মস্তিষ্কের সবচেয়ে সাধারণ ধরণের
প্রাথমিক টিউমার। গ্লিওমা গ্লিয়াল কোষ (glial cells) থেকে উৎপন্ন হয়, যা স্নায়ুকোষকে সমর্থন করে। গ্লিওমার মধ্যে
বিভিন্ন উপ-প্রকার রয়েছে:
(ক) অ্যাস্ট্রোসাইটোমা (Astrocytoma): অ্যাস্ট্রোসাইট (astrocytes) নামক গ্লিয়াল কোষ থেকে উৎপন্ন হয়। গ্লিওব্লাস্টোমা
(Glioblastoma - GBM) হলো অ্যাস্ট্রোসাইটোমার একটি অত্যন্ত আক্রমনাত্মক এবং দ্রুত বর্ধনশীল রূপ, যা প্রাপ্তবয়স্কদের
মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ম্যালিগন্যান্ট ব্রেন টিউমার।
(খ) অলগিওডেন্ড্রোগ্লিওমা (Oligodendroglioma): অলগিওডেন্ড্রোসাইট (oligodendrocytes) নামক গ্লিয়াল কোষ থেকে
উৎপন্ন হয়, যা স্নায়ুকোষকে রক্ষা করে।
(গ) এপেনডাইমোমা (Ependymoma): এপেনডাইমাল কোষ (ependymal cells) থেকে উৎপন্ন হয়, যা মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের
ভেতরের ভেন্ট্রিকেল (ventricles) এবং কেন্দ্রীয় খালকে আবৃত করে।
(ঘ) মেনিনজিওমা (Meningioma): এটি মস্তিষ্কের এবং মেরুদণ্ডের আবরণে (মেনিনজেস) উৎপন্ন হয়। বেশিরভাগ মেনিনজিওমা
বেনাইন হলেও, কিছু ক্ষেত্রে ম্যালিগন্যান্ট হতে পারে। এটি মস্তিষ্কের বাইরের টিউমারগুলির মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ।
(ঙ) মেডিউলোব্লাস্টোমা (Medulloblastoma): এটি সাধারণত শিশুদের মধ্যে দেখা যায় এবং মস্তিষ্কের পেছনের অংশে
(সেরিবেলাম) শুরু হয়। এটি একটি দ্রুত বর্ধনশীল টিউমার।
(চ) পিটুইটারি টিউমার (Pituitary Tumors): পিটুইটারি গ্রন্থিতে উৎপন্ন হয়, যা মস্তিষ্কের গোড়ায় অবস্থিত। বেশিরভাগ
পিটুইটারি টিউমার বেনাইন হয়।
(ছ) লিম্ফোমা (Lymphoma): এটি মস্তিষ্কে শুরু হতে পারে (প্রাইমারি সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম লিম্ফোমা - PCNSL) অথবা
শরীরের অন্য স্থান থেকে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
(জ) স্যোয়ান্নোমা (Schwannoma) / অ্যাকোস্টিক নিউরোমা (Acoustic Neuroma): এটি স্নায়ুর আবরণ (Schwann cells)
থেকে উৎপন্ন হয়, যা স্নায়ুকোষকে ঘিরে থাকে। অ্যাকোস্টিক নিউরোমা হলো শ্রাবণ স্নায়ুর একটি স্যোয়ান্নোমা।
সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট কারণ প্রায়শই অজানা থাকে। তবে কিছু ঝুঁকির কারণ এটিকে প্রভাবিত করতে পারে:
(ক) বয়স: ব্রেন টিউমার যেকোনো বয়সে হতে পারে, তবে কিছু প্রকার
শিশুদের মধ্যে এবং কিছু প্রকার বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
(খ) বিকিরণ (Radiation): পূর্বে মস্তিষ্কে উচ্চ মাত্রার বিকিরণ থেরাপি গ্রহণ করলে ব্রেন টিউমারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
(গ) জিনগত কারণ: কিছু বিরল জিনগত সিন্ড্রোম, যেমন নিউরোফাইব্রোমাটোসিস (Neurofibromatosis), টুবেরাস
স্ক্লেরোসিস (Tuberous Sclerosis), লি-ফ্রাওমেনি সিন্ড্রোম (Li-Fraumeni syndrome) এবং ভন হিপেল-লিন্ডাউ ডিজিজ (Von Hippel-Lindau
disease) ব্রেন টিউমারের ঝুঁকি বাড়ায়।
(ঘ) দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা: এইচআইভি/এইডস বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের কারণে দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকলে
লিম্ফোমার মতো কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
(ঙ) পরিবেশগত কারণ: মোবাইল ফোন ব্যবহার বা কিছু নির্দিষ্ট রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার মতো পরিবেশগত
কারণগুলোর সাথে ক্যান্সারের যোগসূত্র নিয়ে গবেষণা চলছে, তবে নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
(খ) স্টেজিং (Staging): ক্যান্সার শরীরের কতটা অংশে ছড়িয়েছে, তার উপর ভিত্তি করে পর্যায় নির্ধারণ করা হয় (পর্যায় I থেকে IV) প্রথম পর্যায়ে ক্যান্সার একটি ছোট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে, আর চতুর্থ পর্যায়ে ক্যান্সার দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে (মেটাস্ট্যাসিস)। ক্যান্সারের ধরন, গ্রেড এবং পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি ভিন্ন হয়, যার মধ্যে সাধারণত সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকে।
(১) মাথাব্যথা: এটি সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে একটি এবং
প্রায়শই সকালে খারাপ হয়, ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং ব্যথানাশক ওষুধেও কমে না।
(২) বমি বমি ভাব এবং বমি: মস্তিষ্কে চাপ বাড়ার কারণে হতে পারে।
(৩) খিঁচুনি (Seizures): নতুন ধরণের খিঁচুনি হতে পারে, বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে।
(৪) দৃষ্টি সমস্যা: ঝাপসা দৃষ্টি, ডাবল ভিশন বা দৃষ্টিশক্তির আংশিক ক্ষতি।
(৫) শারীরিক দুর্বলতা বা অসাড়তা: শরীরের একপাশে বা একটি অঙ্গে দুর্বলতা বা অসাড়তা।
(৬) ভারসাম্য এবং সমন্বয়ের সমস্যা: হাঁটাচলায় অসুবিধা, ভারসাম্যহীনতা।
(৭) কথা বলতে বা বুঝতে অসুবিধা: ভাষা প্রক্রিয়াকরণে সমস্যা।
(৮) স্মৃতিশক্তি বা ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন: বিভ্রান্তি, মেজাজের পরিবর্তন, সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা।
(৯) ক্লান্তি: অতিরিক্ত ক্লান্তি। মেরুদণ্ডের টিউমারের ক্ষেত্রে, লক্ষণগুলোর মধ্যে পিঠের ব্যথা,
হাত-পায়ে দুর্বলতা, অসাড়তা, প্রস্রাব বা মলত্যাগের সমস্যা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম ক্যান্সারের চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল এবং এটি টিউমারের ধরন, অবস্থান, আকার, রোগীর বয়স এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে। একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি দল (স্নায়ু সার্জন, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিকেল অনকোলজিস্ট, স্নায়ুবিজ্ঞানী) একসাথে কাজ করে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করে। প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো:
(১) সার্জারি (Surgery): সম্ভব হলে টিউমার অপসারণ করাই প্রধান
চিকিৎসা। মস্তিষ্কের সংবেদনশীল অংশের কাছাকাছি টিউমার থাকলে আংশিক অপসারণ করা হতে পারে।
(২) রেডিয়েশন থেরাপি (Radiation Therapy): উচ্চ-শক্তির বিকিরণ ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ
ধ্বংস করা। এটি সার্জারির পর অবশিষ্ট কোষ ধ্বংস করতে বা সার্জারি সম্ভব না হলে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
(৩) কেমোথেরাপি (Chemotherapy): ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার জন্য ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
মস্তিষ্কের রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক (blood-brain barrier) ভেদ করে এমন ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
(৪) টার্গেটেড থেরাপি (Targeted Therapy): নির্দিষ্ট জিন বা প্রোটিনকে লক্ষ্য করে ক্যান্সার কোষের
বৃদ্ধি বন্ধ করা। এটি কিছু নির্দিষ্ট ধরণের ব্রেন টিউমারের জন্য ব্যবহৃত হয়।
(৫) ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy): রোগীর নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ক্যান্সার কোষের
বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উদ্দীপিত করা।
(৬) ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (Clinical Trials): নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির গবেষণা করা হয় এবং কিছু রোগীর
জন্য এগুলি একটি বিকল্প হতে পারে।
(৭) সহায়ক যত্ন (Supportive Care): লক্ষণগুলো যেমন ব্যথা, খিঁচুনি, বমি বমি ভাব কমানোর জন্য ওষুধ
ব্যবহার করা হয়। শারীরিক থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি এবং স্পিচ থেরাপিও সহায়ক হতে পারে। সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম ক্যান্সার একটি
গুরুতর রোগ হলেও, চিকিৎসার অগ্রগতিতে রোগীদের জীবনকাল এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে। প্রাথমিক সনাক্তকরণ এবং বিশেষজ্ঞ
চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে একটি সমন্বিত চিকিৎসা পরিকল্পনা এর ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।