ডায়াবেটিস (ডায়াবেটিস মেলিটাস) একটি বিপাকীয় রোগ যেখানে শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণে ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না অথবা উৎপন্ন ইনসুলিনকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না, যার ফলে রক্তে শর্করার (গ্লুকোজ) মাত্রা বেড়ে যায়। এটি বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে, যার মধ্যে প্রধানগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
টাইপ ১ ডায়াবেটিস একটি অটোইমিউন রোগ। এর অর্থ হলো, শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে অগ্ন্যাশয়ের (Pancreas) ইনসুলিন উৎপাদনকারী বিটা কোষগুলোকে আক্রমণ করে এবং ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না বা খুবই কম পরিমাণে তৈরি করে। ইনসুলিন ছাড়া শরীরের কোষগুলো রক্ত থেকে গ্লুকোজ শোষণ করে শক্তি উৎপাদন করতে পারে না, ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়।
(ক) কাদের হয়: এটি সাধারণত শিশু, কিশোর-কিশোরী
এবং তরুণদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে যেকোনো বয়সে এটি হতে পারে।
(খ) কারণ: এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও অজানা, তবে জেনেটিক প্রবণতা এবং পরিবেশগত কিছু
কারণকে (যেমন ভাইরাস সংক্রমণ) দায়ী করা হয়।
(গ) লক্ষণ: লক্ষণগুলো হঠাৎ করেই দেখা যায় এবং দ্রুত খারাপ হতে পারে। যেমন: অতিরিক্ত তৃষ্ণা,
ঘন ঘন প্রস্রাব, অপ্রত্যাশিত ওজন হ্রাস, অতিরিক্ত ক্ষুধা, ক্লান্তি এবং ঝাপসা দৃষ্টি।
(ঘ) চিকিৎসা: টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের বেঁচে থাকার জন্য আজীবন ইনসুলিন ইনজেকশন নিতে
হয়। পাশাপাশি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং নিয়মিত ব্যায়াম অপরিহার্য।
টাইপ ২ ডায়াবেটিস ডায়াবেটিসের সবচেয়ে সাধারণ প্রকার। এই ধরনের ডায়াবেটিসে শরীর হয়তো পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করে, কিন্তু কোষগুলো সেই ইনসুলিনের প্রতি সঠিকভাবে সাড়া দেয় না, যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স নামে পরিচিত। অথবা, সময়ের সাথে সাথে অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে রক্তে গ্লুকোজ জমা হয় এবং তা কোষে প্রবেশ করতে পারে না।
(ক) কাদের হয়: এটি সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও,
অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং স্থূলতার কারণে আজকাল অল্পবয়সীদের মধ্যেও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের হার বাড়ছে।
(খ) কারণ: এর পেছনে জেনেটিক্স, স্থূলতা, শারীরিক কার্যকলাপের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
এবং বয়স একটি বড় ভূমিকা পালন করে।
(গ) লক্ষণ: লক্ষণগুলো সাধারণত ধীরে ধীরে বিকশিত হয় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় স্পষ্ট
হয় না। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, ক্লান্তি, ঝাপসা দৃষ্টি, বারবার সংক্রমণ, ক্ষত শুকাতে
দেরি হওয়া এবং হাত-পায়ে অসাড়তা বা ঝিনঝিন করা।
(ঘ) চিকিৎসা: প্রাথমিকভাবে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, যেমন স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং
ওজন নিয়ন্ত্রণ এর মাধ্যমে টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অনেক সময় মুখে খাওয়ার ওষুধ এবং কিছু ক্ষেত্রে
ইনসুলিনের প্রয়োজন হতে পারে।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এমন একটি অবস্থা যা গর্ভাবস্থায় কোনো মহিলার শরীরে
প্রথমবার ধরা পড়ে, যখন তার আগে ডায়াবেটিস ছিল না। গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তন ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স সৃষ্টি করতে
পারে, যার ফলে শরীর গ্লুকোজকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না।
(ক) কাদের হয়: এটি শুধুমাত্র গর্ভবতী মহিলাদের হয়।
(খ) কারণ: গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা থেকে নিঃসৃত হরমোন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে রক্তে
শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়।
(গ) লক্ষণ: সাধারণত গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না, তাই স্ক্রিনিং টেস্টের মাধ্যমে এটি
নির্ণয় করা হয়।
(ঘ) ঝুঁকি: গর্ভকালীন ডায়াবেটিস মা এবং শিশুর জন্য কিছু ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যেমন সিজারিয়ান ডেলিভারির
সম্ভাবনা, বড় শিশুর জন্ম (ম্যাক্রোসোমিয়া) এবং শিশুর জন্মের পর রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়া।
(ঙ) চিকিৎসা: সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, এবং কিছু ক্ষেত্রে ইনসুলিনের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রসবের পর এই ডায়াবেটিস চলে যায়, তবে পরবর্তীতে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
উপরিউক্ত প্রধান প্রকারগুলি ছাড়াও আরও কিছু ডায়াবেটিস রয়েছে, যদিও সেগুলো তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়:
(ক) মনোজেনিক ডায়াবেটিস (Monogenic Diabetes): এটি একটি একক জিনের
ত্রুটির কারণে হয়। এর মধ্যে রয়েছে:
(১) MODY (Maturity-Onset Diabetes of the Young): সাধারণত অল্প বয়সে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের মতো লক্ষণ
নিয়ে দেখা দেয়, কিন্তু এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের কারণে হয় না, বরং বিটা কোষের ইনসুলিন উৎপাদনে সমস্যা থেকে হয়।
(২) নবজাতকের ডায়াবেটিস (Neonatal Diabetes): জন্মের প্রথম ছয় মাসের মধ্যে দেখা যায় এবং এটি অত্যন্ত বিরল।
(খ) সেকেন্ডারি ডায়াবেটিস (Secondary Diabetes): এটি অন্য কোনো রোগ বা অবস্থার কারণে হয়, যেমন:
(১) প্যানক্রিয়াটাইটিস বা অগ্ন্যাশয়ের ক্ষতি: অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ বা ক্ষতির ফলে ইনসুলিন উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
(২) হরমোনজনিত রোগ: কুশিং সিন্ড্রোম বা অ্যাক্রোমেগালি (Acromegaly) এর মতো হরমোনজনিত সমস্যা।
(৩) কিছু ঔষধ: কিছু ঔষধ, যেমন স্টেরয়েড, রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে। ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ হলেও
সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে এটিকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যদি আপনার ডায়াবেটিসের কোনো লক্ষণ
দেখা যায়, তবে দ্রুত একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।