ফিস্টুলা, যা বাংলায় 'ভগন্দর' নামে পরিচিত, একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা যা সাধারণত মলদ্বারের আশেপাশে দেখা যায়। এটি একটি অস্বাভাবিক ছোট সুড়ঙ্গ বা নালী যা শরীরের দুটি ফাঁপা অঙ্গ বা একটি অঙ্গ এবং ত্বকের পৃষ্ঠের মধ্যে তৈরি হয়। ১৯৭৬ সালে পার্কস ফিস্টুলার যে শ্রেণিবিভাগ করেন, সেটি এখনও চিকিৎসা জগতে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। যদিও ফিস্টুলা চিকিৎসায় বহু পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে, তবে কোনটি শ্রেষ্ঠ বা যথাযথ, সে বিষয়ে চিকিৎসকরা এখনও সম্পূর্ণ ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেননি।
ফিস্টুলা হওয়ার প্রধান কারণ হলো মলদ্বারের আশেপাশের গ্রন্থিগুলোর
(Anal glands) সংক্রমণ। এই গ্রন্থিগুলো সাধারণত মিউকাস বা শ্লেষ্মা তৈরি করে যা মলত্যাগে সহায়তা
করে। যখন এই গ্রন্থিগুলো কোনো কারণে আটকে যায়, তখন সেখানে ব্যাকটেরিয়া জন্মে এবং পুঁজ
(Abscess) তৈরি হয়। এই পুঁজ জমা হয়ে ফোড়া তৈরি করে। যদি এই ফোড়া ফেটে যায় বা অস্ত্রোপচারের
মাধ্যমে নিষ্কাশন করা হয় এবং সম্পূর্ণরূপে নিরাময় না হয়, তখন একটি নালী তৈরি হয় যা ফিস্টুলা নামে
পরিচিত। মলদ্বারে ফোড়া হওয়া প্রায় ৫০% রোগীর ফিস্টুলা হয়ে থাকে।
এছাড়াও, ফিস্টুলা হওয়ার অন্যান্য কিছু কারণ হলো-
(ক) ক্রোহন'স ডিজিজ (Crohn's Disease): এটি অন্ত্রের একটি প্রদাহজনিত রোগ যা ফিস্টুলার একটি প্রধান কারণ।
(খ) মলদ্বারের যক্ষ্মা: যক্ষ্মা মলদ্বারে ফিস্টুলা সৃষ্টি করতে পারে।
(গ) বৃহদন্ত্রের প্রদাহ (Inflammatory Bowel Disease): আলসারেটিভ কোলাইটিস বা অন্যান্য প্রদাহজনিত রোগের কারণেও ফিস্টুলা হতে পারে।
(ঘ) মলদ্বারের ক্যান্সার: কিছু ক্ষেত্রে মলদ্বারের ক্যান্সারের জটিলতা হিসেবে ফিস্টুলা দেখা দিতে পারে।
(ঙ) ডাইভারটিকিউলাইটিস (Diverticulitis): পরিপাকতন্ত্রের ছোট থলির প্রদাহ।
(চ) যৌন সংক্রামিত রোগ (STIs): কিছু যৌন সংক্রামিত রোগও ফিস্টুলার কারণ হতে পারে।
(ছ) আঘাত বা অস্ত্রোপচার: পূর্বের কোনো অস্ত্রোপচার বা আঘাতের জটিলতা হিসেবে ফিস্টুলা তৈরি হতে পারে।
(জ) ডায়াবেটিস: ডায়াবেটিস আক্রান্তদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে, যা ফিস্টুলার কারণ হতে পারে।
ফিস্টুলার লক্ষণগুলো রোগীর অবস্থাভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণত নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা যায়-
(ক) মলদ্বারের আশেপাশে ব্যথা ও জ্বালা: এটি ফিস্টুলার সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। ব্যথা সাধারণত একটানা টনটনে থাকে
এবং বসলে, হাঁটাচলা করলে, কাশি দিলে বা পায়খানা করার সময় আরও বেড়ে যায়।
(খ) পুঁজ বা রক্তক্ষরণ: মলদ্বারের আশেপাশে একটি বা একাধিক ছিদ্র থেকে দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বা রক্ত নির্গত হতে পারে।
পুঁজ বের হওয়ার পর ব্যথা কিছুটা কমতে পারে।
(গ) ফুলে যাওয়া ও লালচে ভাব: ফিস্টুলার কারণে মলদ্বারের আশেপাশে ফোলা এবং লালচে ভাব দেখা যেতে পারে।
(ঘ) চুলকানি ও অস্বস্তি: পুঁজ ও স্রাবের কারণে মলদ্বারের চারপাশের ত্বকে জ্বালা-পোড়া বা চুলকানি হতে পারে।
(ঙ) জ্বর: যদি ফিস্টুলাতে সংক্রমণ গুরুতর হয় বা ফোড়া থাকে, তাহলে রোগীর জ্বর আসতে পারে।
(চ) মল বা মূত্রের অসংযম (Incontinence): কিছু জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে রোগীর মল বা মূত্রের
ওপর নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে।
(ছ) ডায়রিয়া (যদি গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ফিস্টুলা হয়): অন্ত্রের ভেতরের ফিস্টুলার ক্ষেত্রে ডায়রিয়া,
পানিশূন্যতা এবং পুষ্টির অভাব দেখা দিতে পারে।
(জ) মলদ্বারের চারপাশে একটি পিণ্ড বা ফোলা: ফিস্টুলার মুখটি ত্বকের নিচে একটি পিণ্ড হিসেবে
অনুভূত হতে পারে। সর্বোপরি বলা যায়, ফিস্টুলার ইতিহাস বেশ পুরনো। প্রায় ২০০০ বছর আগের বই-পুস্তকেও ফিস্টুলা সম্পর্কে
আলোচনা পাওয়া যায়। প্রাচীনকাল থেকেই চিকিৎসকগণ এই রোগের সাথে পরিচিত ছিলেন এবং এর চিকিৎসার বিভিন্ন পদ্ধতির
অন্বেষণ করেছেন, যা বর্তমানে ও চলমান রয়েছে।