ফিস্টুলা, যা বাংলায় ভগন্দর নামে পরিচিত, একটি প্রাচীন রোগ যা মানবজাতিকে দীর্ঘকাল ধরে ভোগাচ্ছে। এর ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরোনো। একটি দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় চিকিৎসাগত বিবর্তনের ধারাকে নির্দেশ করে। নিচে সংক্ষেপে এই রোগটির ইতিহাস তুলে ধরা হলো:
(ক) মিশরীয় ও হিপোক্রেটিক যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ সাল):
ফিস্টুলা, বিশেষ করে অ্যানাল ফিস্টুলা, মানব ইতিহাসে বহু পুরাতন একটি রোগ। হিপোক্রেটিস ফিস্টুলাকে একটি
জটিল, পুনঃপুন ফিরে আসা পুঁজযুক্ত সংক্রমণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
(খ) ২০০০ বছর আগে: প্রাচীন বই-পুস্তকেও ফিস্টুলা সম্পর্কে আলোচনা পাওয়া যায়।
এর থেকে বোঝা যায় যে, এই রোগটি অনেক আগে থেকেই মানুষের পরিচিত ছিল।
(গ) হিপোক্রেটিস (আনুমানিক ৪৩০ খ্রিস্টপূর্ব): গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিসকে সর্বপ্রথম
ফিস্টুলার অস্ত্রোপচারভিত্তিক চিকিৎসা করার জন্য কৃতিত্ব দেওয়া হয়। তার লেখায় ফিস্টুলা চিকিৎসার পদ্ধতি সম্পর্কে
ধারণা পাওয়া যায়, যা আধুনিক চিকিৎসার ভিত্তি স্থাপন করে। গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস তাঁর চিকিৎসা সংকলনে
ফিস্টুলা রোগের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তিনি ফিস্টুলা নির্ণয়ের জন্য ‘seton technique’ (এক ধরনের সুতা
ঢুকিয়ে রাখা) ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
(ক) এই সময়ে চিকিৎসা ছিল অনেকটাই ধর্মীয় ও পারিপার্শ্বিক বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল।
(খ) ফিস্টুলা, বিশেষত মলদ্বারে ফিস্টুলা, তখনও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা হতো তবে সীমিত জ্ঞান ও জীবাণুবিজ্ঞান
না থাকার কারণে অনেক সময় রোগী মৃত্যুবরণ করতেন।
(ক) ১৮১৮ সালে ব্রিটিশ সার্জন সার চার্লস বেল এবং অন্যরা ফিস্টুলার অপারেশন কৌশল উন্নত করেন।
(খ) seton technique: সেটন টেকনিক হলো এক ধরনের অস্ত্রোপচার পদ্ধতি যেখানে ফিস্টুলার
সুড়ঙ্গের (fistula tract) মধ্যে একটি বিশেষ সুতা বা রাবারের টিউব (সেটন) ঢুকিয়ে রাখা হয়। এই সেটনটি সুড়ঙ্গের দুই
প্রান্তকে সংযুক্ত করে, যাতে সুড়ঙ্গের ভেতরের দিক থেকে বাইরের দিকে ক্রমাগত পুঁজ বা তরল নিষ্কাশিত হতে পারে। এটি
ধীরে ধীরে সুড়ঙ্গটিকে নিরাময় করতে সাহায্য করে।
(গ) সেটন (Seton) পদ্ধতি: কিছু জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে একটি সেলাই বা টিউব নালির মধ্যে
দিয়ে ঢুকিয়ে কয়েক সপ্তাহ রেখে দেওয়া হয় যাতে এটি ধীরে ধীরে নিরাময় হয় এবং ফোড়া নিষ্কাশিত হয়।
(ঘ) অ্যানেসথেশিয়া (অচেতন করার পদ্ধতি) ও জীবাণুমুক্ত অস্ত্রোপচারের কারণে ফিস্টুলার চিকিৎসায় সাফল্য বাড়ে।
(ক) সার্জিকাল টেকনিক: Fistulectomy, Fistulotomy, Seton
placement, LIFT (ligation of intersphincteric fistula tract), ও laser-assisted surgery ব্যবহৃত হয়।
(খ) প্রগতিশীল চিকিৎসা: উন্নত ইমেজিং (MRI, ultrasound) দিয়ে fistula চিহ্নিত করা হয়।
(গ) হোমিওপ্যাথি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা: কিছু বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতিও জনপ্রিয়তা পায়, বিশেষ
করে India, Bangladesh এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে।
(ঘ) কিছু বিখ্যাত ব্যক্তি: বলা হয় ফরাসি রাজা লুই ১৪ ছিলেন অ্যানাল ফিস্টুলার রোগী, এবং তাঁর
জন্য একটি বড় অপারেশন করা হয়েছিল ১৬৮৭ সালে। এটি ইউরোপে সার্জারির ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা করেছিল।
সাধারণত মলদ্বারের গ্রন্থি (Anal gland) বন্ধ হয়ে সংক্রমিত হলে বিষফোঁড়া (Abscess) হয়।
এই বিষফোঁড়া ফেটে গিয়ে একটি অস্বাভাবিক নালি তৈরি করে, যা ফিস্টুলা নামে পরিচিত। মলদ্বারে বিষফোঁড়া হওয়া প্রায় ৫০%
রোগীর ফিস্টুলা হয়ে থাকে। ফিস্টুলার মূল কারণ সবসময় স্পষ্ট না হলেও কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
(ক) সংক্রমণ: মলদ্বারের ভেতরে থাকা জীবাণু থেকে সংক্রমণ শুরু হতে পারে, যা ফোড়া তৈরি করে এবং পরে ফিস্টুলায় পরিণত হয়।
(খ) ক্রোহনস ডিজিজ বা কোলাইটিস: প্রদাহজনিত পেটের রোগ, যেমন ক্রোহনস ডিজিজ বা কোলাইটিস থেকেও ফিস্টুলা হতে পারে।
(গ) যক্ষ্মা (টিবি): মলদ্বারে যক্ষ্মার কারণেও ফিস্টুলা হতে পারে।
(ঘ) ক্যান্সার: কিছু ক্ষেত্রে মলদ্বারের ক্যান্সার বা পেলভিক অঞ্চলের ক্যান্সারের কারণেও ফিস্টুলা দেখা দিতে পারে।
(ঙ) প্রসবকালীন আঘাত: মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রসবকালীন আঘাত, যেমন গভীর টিয়ার বা এপিজিওটমি
(পেরিনিয়ামের অস্ত্রোপচার) থেকে রেক্টোভ্যাজাইনাল ফিস্টুলা (মলদ্বার ও যোনিপথের মধ্যে সংযোগ) হতে পারে।
(চ) অস্ত্রোপচার: মলদ্বার, যোনি, বা পেরিনিয়ামের পূর্ববর্তী অস্ত্রোপচারের সংক্রমণ বা আঘাত থেকেও ফিস্টুলা তৈরি হতে পারে।
(ছ) ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়াবেটিস: এগুলো সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা ফিস্টুলার কারণ হতে পারে।
(জ) ঐতিহ্যবাহী অস্ত্রোপচার: একসময় ফিস্টুলা অপসারণের জন্য প্রচলিত অস্ত্রোপচারই একমাত্র উপায় ছিল।
এতে ক্ষত শুকাতে সময় লাগত এবং অনেক সময় জটিলতা দেখা দিত।
(ঝ) পার্কসের শ্রেণিবিভাগ (১৯৭৬): সার্জন পার্কস ফিস্টুলার একটি শ্রেণিবিভাগ করেন যা আজও চিকিৎসা
ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। এই শ্রেণিবিভাগ ফিস্টুলার ধরন ও জটিলতা বুঝতে সাহায্য করে।
বর্তমানে ফিস্টুলার চিকিৎসায় বিভিন্ন আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যা কম আক্রমণাত্মক এবং দ্রুত পুনরুদ্ধারে সহায়ক:
(ক) লেজার সার্জারি: এটি একটি ন্যূনতম আক্রমণাত্মক পদ্ধতি যেখানে লেজার প্রোব ব্যবহার করে ফিস্টুলার টিস্যু ধ্বংস করে নালি বন্ধ করা হয়।
(খ) LIFT (Ligation of Intersphincteric Fistula Tract) টেকনিক: এই পদ্ধতিতে ফিস্টুলার নালিকে
সম্পূর্ণরূপে না কেটে বা বড় ধরনের কাটাছেঁড়া ছাড়াই চিকিৎসা করা হয়।
(গ) ফাইব্রিন গ্লু বা প্লাগ: ফিস্টুলার নালি পূরণ করার জন্য বিশেষ আঠা বা প্লাগ ব্যবহার করা হয়।
(ঘ) অ্যাডভান্সমেন্ট ফ্ল্যাপ পদ্ধতি: স্বাস্থ্যকর টিস্যুর একটি অংশ ব্যবহার করে ফিস্টুলার গর্ত ঢেকে দেওয়া হয়।
ফিস্টুলা রোগ ইতিহাসে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা একটি পরিচিত জটিল সমস্যা, যার চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে উন্নত ও নিরাপদ হয়েছে। তবে এখনো এটি একটি চ্যালেঞ্জিং রোগ, বিশেষ করে যদি এটি জটিল হয়ে যায় বা পুনরায় দেখা দেয়।