১৯৭৬ সালে প্রফেসর অ্যালান জি. পার্কস (Prof. Alan G. Parks) কর্তৃক প্রস্তাবিত ফিস্টুলার শ্রেণিবিন্যাস (Parks Classification) সত্যিই এখনো বিশ্বজুড়ে সর্বজন স্বীকৃত ও প্রশংসিত এবং এটি ফিস্টুলার চিকিৎসা পরিকল্পনায় একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তার শ্রেণিবিন্যাস মলদ্বারের স্ফিংটার পেশিগুলির (sphincter muscles) সাথে ফিস্টুলার নালির সম্পর্ক বোঝাতে সাহায্য করে, যা জটিলতার মাত্রা এবং চিকিৎসার পদ্ধতির উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
পার্কস ফিস্টুলাকে মূলত চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করেন-
(১) ইন্টারস্ফিনক্টেরিক ফিস্টুলা (Intersphincteric Fistula): এটি সবচেয়ে
সাধারণ প্রকার, যেখানে ফিস্টুলার নালিটি ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল স্ফিংটার পেশিগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে থাকে।
(২) ট্রান্সস্ফিনক্টেরিক ফিস্টুলা (Transsphincteric Fistula): এই ক্ষেত্রে নালিটি
ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল স্ফিংটার পেশি উভয়কে ভেদ করে যায়।
(৩) সুপ্রাস্ফিনক্টেরিক ফিস্টুলা (Suprasphincteric Fistula): নালিটি ইন্টারনাল
স্ফিংটারকে ভেদ করে এবং এক্সটারনাল স্ফিংটারের উপর দিয়ে গিয়ে পেরিয়ানাল চামড়ার দিকে আসে।
(৪) এক্সট্রাস্ফিনক্টেরিক ফিস্টুলা (Extrasphincteric Fistula): এটি সবচেয়ে
বিরল এবং জটিল প্রকার, যেখানে নালিটি স্ফিংটার পেশিগুলোকে সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করে এবং
পেলভিসের উপরের অংশ থেকে মলদ্বারের বাইরের দিকে আসে। এই শ্রেণিবিন্যাস সার্জনদের ফিস্টুলার
অ্যানাটমি বুঝতে ও এর জটিলতা মূল্যায়ন করতে এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে।
পার্কসের শ্রেণিবিন্যাসের পর থেকে ফিস্টুলা চিকিৎসায় অসংখ্য নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন
হয়েছে, যার মধ্যে কিছু প্রচলিত পদ্ধতির উন্নত সংস্করণ এবং কিছু সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তি। -এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
(ক) ফিস্টুলোটমি (Fistulotomy): এটি সরল ফিস্টুলার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
(খ) সেটন (Seton) পদ্ধতি: জটিল ফিস্টুলার জন্য, বিশেষ করে যেখানে স্ফিংটারের ক্ষতি
এড়াতে হবে, সেটন স্থাপন করা হয়।
(গ) ফিস্টুলা প্লাগ (Fistula Plug): ফিস্টুলার নালিকে ভরাট করার জন্য জৈব উপাদান
দিয়ে তৈরি প্লাগ ব্যবহার করা হয়।
(ঘ) ফাইব্রিন গ্লু (Fibrin Glue): ফিস্টুলার নালির ভেতরে এক ধরনের আঠা প্রবেশ করিয়ে বন্ধ করা হয়।
(ঙ) LIFT (Ligation of Intersphincteric Fistula Tract): এটি একটি আধুনিক
পদ্ধতি যা স্ফিংটার পেশিগুলির মধ্যে ফিস্টুলার নালিকে বেঁধে বন্ধ করে দেয়।
(চ) অ্যাডভান্সমেন্ট ফ্ল্যাপ (Advancement Flap): স্বাস্থ্যকর টিস্যু ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ ছিদ্র বন্ধ করা হয়।
(ছ) লেজার সার্জারি (Laser Surgery): ফিস্টুলার নালিকে লেজার রশ্মি দিয়ে পুড়িয়ে বা
বন্ধ করে দেওয়া হয় (যেমন FiLAC - Fistula-tract Laser Closure)।
(জ) ভিডিও অ্যাসিস্টেড অ্যানাল ফিস্টুলা ট্রিটমেন্ট (VAAFT - Video-assisted Anal Fistula Treatment):
এন্ডোস্কোপ ব্যবহার করে ফিস্টুলার নালি দেখা এবং পরিষ্কার করা হয়।
(ঝ) স্টেম সেল থেরাপি (Stem Cell Therapy): নতুন এবং পরীক্ষামূলক একটি পদ্ধতি,
যেখানে স্টেম সেল ব্যবহার করে নালির নিরাময়কে উদ্দীপিত করা হয়।
চিকিৎসক মহলে "কোন পদ্ধতি শ্রেষ্ঠ" এই বিষয়ে ঐকমত্যের
অভাবের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে:
(১) ফিস্টুলার জটিলতা ও বৈচিত্র্য: ফিস্টুলা কোনো একক রোগ নয়। এর নালির পথ,
শাখা-প্রশাখা, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ছিদ্রের সংখ্যা, স্ফিংটার পেশি জড়িত থাকার মাত্রা, এবং underlying কারণ
(যেমন ক্রোহনস ডিজিজ, টিবি) একেক রোগীর ক্ষেত্রে একেকরকম হয়। একটি পদ্ধতি যা সরল ফিস্টুলার জন্য
কার্যকর, তা জটিল ফিস্টুলার জন্য নাও হতে পারে।
(২) চিকিৎসার লক্ষ্য: ফিস্টুলা চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্য হলো রোগ নিরাময় করা এবং
একই সাথে মল ধরে রাখার ক্ষমতা (fecal continence) বজায় রাখা। কিছু পদ্ধতিতে নিরাময়ের হার বেশি হলেও
ইনকন্টিনেন্সের ঝুঁকি বেশি, আবার কিছু পদ্ধতিতে ইনকন্টিনেন্সের ঝুঁকি কম হলেও নিরাময়ের হার কম।
(৩) সার্জনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা: প্রতিটি পদ্ধতির জন্য নির্দিষ্ট দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার
প্রয়োজন হয়। একজন সার্জন যে পদ্ধতিতে বেশি অভিজ্ঞ, তিনি সেই পদ্ধতিতেই সেরা ফলাফল অর্জন করতে পারেন।
(৪) রোগীর প্রোফাইল: রোগীর বয়স, সামগ্রিক স্বাস্থ্য, অন্যান্য বিদ্যমান রোগ (যেমন ডায়াবেটিস,
ক্রোহনস ডিজিজ), এবং পূর্ববর্তী চিকিৎসার ইতিহাসও পদ্ধতির কার্যকারিতা এবং পছন্দকে প্রভাবিত করে।
(৫) পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি (Recurrence Rate): কিছু পদ্ধতির পুনরাবৃত্তির হার বেশি, আবার কিছু
পদ্ধতির কম। তবে, কোনো পদ্ধতিই শতভাগ সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না।
(৬) দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল: অনেক নতুন পদ্ধতির দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল সম্পর্কে পর্যাপ্ত ডেটা
এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে, চিকিৎসকরা পুরোনো এবং প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতির উপর বেশি আস্থা রাখতে পারেন, যদি না নতুন
পদ্ধতিগুলোর দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা প্রমাণিত হয়।
(৭) গবেষণা ও প্রমাণ: বিভিন্ন পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে, কোনো একক
পদ্ধতিকে "সেরা" প্রমাণ করার জন্য পর্যাপ্ত উচ্চ-মানের তুলনামূলক গবেষণা প্রায়শই থাকে না। এ কারণে, আধুনিক ফিস্টুলা
চিকিৎসায় একটি ব্যক্তিগতকৃত দৃষ্টিভঙ্গি (individualized approach) গ্রহণ করা হয়। সার্জন রোগীর ফিস্টুলার ধরন,
জটিলতা, রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং নিজস্ব অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে সবচেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতিটি নির্বাচন করেন।
এটি কোনো একক পদ্ধতির শ্রেষ্ঠত্বের চেয়ে রোগীর জন্য সর্বোত্তম ফলাফল অর্জনের উপর জোর দেয়।