গ্যাস্ট্রিক বা গ্যাস্ট্রাইটিস (Gastritis) হলো পাকস্থলীর ভেতরের আবরণে (মিউকোসা) প্রদাহ। এই প্রদাহ বিভিন্ন কারণে হতে পারে এবং এর তীব্রতা ও স্থায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে এটিকে বিভিন্ন প্রকারে ভাগ করা যায়। গ্যাস্ট্রিক সাধারণত দুই প্রকারের হয়: তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিস (Acute Gastritis) এবং দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিস (Chronic Gastritis)। এছাড়াও এর কারণ ও বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে আরও কিছু উপপ্রকার আছে।
তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিস হলো পাকস্থলীর আবরণের আকস্মিক এবং গুরুতর প্রদাহ। এটি হঠাৎ করে শুরু হয় এবং সাধারণত অল্প সময়ের জন্য স্থায়ী হয়।
(ক) অ্যাসপিরিন বা ব্যথানাশক ঔষধের ব্যবহার (NSAIDs):
নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস (NSAIDs) যেমন অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন, নেপ্রোক্সেন ইত্যাদি ঔষধের
দীর্ঘমেয়াদী বা অতিরিক্ত ব্যবহারে পাকস্থলীর আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
(খ) অ্যালকোহল: অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনে পাকস্থলীর আবরণে জ্বালাপোড়া ও প্রদাহ হয়।
(গ) মানসিক চাপ (Stress): গুরুতর অসুস্থতা, বড় কোনো আঘাত, পোড়া বা বড় অস্ত্রোপচারের
পর তীব্র মানসিক চাপের কারণেও গ্যাস্ট্রাইটিস হতে পারে, যাকে স্ট্রেস আলসার (Stress Ulcer) বলা হয়।
(ঘ) সংক্রমণ: কিছু ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের সংক্রমণ, বিশেষ করে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি
(Helicobacter pylori) নামক ব্যাকটেরিয়ার তীব্র সংক্রমণ।
(ঙ) রেডিয়েশন থেরাপি (Radiation Therapy): ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য পেটে রেডিয়েশন থেরাপি নিলে গ্যাস্ট্রাইটিস হতে পারে।
(চ) কোকেইন ব্যবহার: কোকেইনের ব্যবহার পাকস্থলীর রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে গ্যাস্ট্রাইটিস ঘটাতে পারে।
(ছ) কস্টিক পদার্থ: ভুলবশত অ্যাসিড বা ক্ষারযুক্ত কস্টিক পদার্থ পান করলে পাকস্থলীর গুরুতর ক্ষতি হয়।
(ক) হঠাৎ পেটে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া (সাধারণত উপরের পেটে)
(খ) বমি বমি ভাব ও বমি
(গ) ক্ষুধা কমে যাওয়া
(ঘ) কালো মল (যদি রক্তপাত হয়)
(ঙ) অম্বল বা বুক জ্বালাপোড়া
দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিস হলো পাকস্থলীর আবরণের দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ, যা ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হয়। এটি পাকস্থলীর আবরণে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এবং কিছু ব্যক্তিগত চিকিৎসক ক্যান্সারের চিকিৎসায় সাফল্যের দাবি করলেও, এই দাবিগুলো আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মানদণ্ডে যাচাই করা কঠিন।
(ক) হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি (H. pylori) সংক্রমণ:
এটি দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। এই ব্যাকটেরিয়া পাকস্থলীর আবরণে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ সৃষ্টি
করে, যা আলসার এবং কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
(খ) অটোইমিউন গ্যাস্ট্রাইটিস (Autoimmune Gastritis): এক্ষেত্রে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত পাকস্থলীর স্বাস্থ্যকর কোষগুলোকে আক্রমণ করে। এটি ভিটামিন বি১২ শোষণে বাধা দিতে পারে এবং পারনিসিয়াস অ্যানিমিয়া (Pernicious Anemia) ঘটাতে পারে।
(গ) অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগ: যেমন ক্রোনস ডিজিজ (Crohn's Disease) বা সারকয়ডোসিস (Sarcoidosis) গ্যাস্ট্রাইটিসের কারণ হতে পারে।
(ঘ) উচ্চ মাত্রায় অ্যালকোহল সেবন: দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন।
(ঙ) পিত্ত রিফ্লাক্স (Bile Reflux): পিত্তথলি থেকে পিত্তরস পাকস্থলীতে ফিরে আসলে প্রদাহ হতে পারে।
(চ) কিছু ঔষধের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার: বিশেষ করে NSAIDs।
(ক) উপরের পেটে হালকা ব্যথা বা অস্বস্তি
(খ) পেট ফাঁপা
(গ) ক্ষুধা মন্দা
(ঘ) বমি বমি ভাব
(ঙ) খাওয়ার পর পেট ভরা লাগা
(চ) পুষ্টি উপাদানের অভাব (বিশেষ করে ভিটামিন বি১২)
উপরে উল্লিখিত প্রধান প্রকারগুলো ছাড়াও, গ্যাস্ট্রাইটিসের কারণ এবং বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কিছু বিশেষ ধরন রয়েছে:
(ক) অ্যাট্রোফিক গ্যাস্ট্রাইটিস (Atrophic Gastritis):
এটি দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিসের একটি রূপ, যেখানে পাকস্থলীর আবরণ এতটাই পাতলা হয়ে যায় যে, এটি অ্যাসিড
এবং এনজাইম উৎপাদনকারী গ্রন্থিগুলো হারিয়ে ফেলে। এটি সাধারণত অটোইমিউন রোগ বা দীর্ঘমেয়াদী H.
pylori সংক্রমণের কারণে ঘটে। এর ফলে ভিটামিন বি১২ এর অভাব হতে পারে।
(খ) ইরোসিভ গ্যাস্ট্রাইটিস (Erosive Gastritis): এই ধরনের গ্যাস্ট্রাইটিসে পাকস্থলীর
আবরণে ক্ষয় বা আলসার (ক্ষত) তৈরি হয়, যা রক্তপাত ঘটাতে পারে। এটি তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী উভয়ই হতে পারে
এবং NSAIDs, অ্যালকোহল, মানসিক চাপ বা কস্টিক পদার্থের কারণে ঘটে।
(গ) নন-ইরোসিভ গ্যাস্ট্রাইটিস (Non-Erosive Gastritis): এক্ষেত্রে পাকস্থলীর আবরণে
প্রদাহ থাকলেও কোনো সুস্পষ্ট ক্ষয় বা আলসার থাকে না। এটি সাধারণত H. pylori সংক্রমণের কারণে ঘটে।
(ঘ) লিম্ফোসাইটিক গ্যাস্ট্রাইটিস (Lymphocytic Gastritis): এটি একটি বিরল প্রকার,
যেখানে পাকস্থলীর আবরণে লিম্ফোসাইট নামক শ্বেত রক্তকণিকার অস্বাভাবিক জমাট বাঁধে। এর কারণ প্রায়শই অজানা,
তবে কিছু ক্ষেত্রে সিরেয়াক ডিজিজ (Celiac Disease) এর সাথে যুক্ত হতে পারে।
(ঙ) ইওসিনোফিলিক গ্যাস্ট্রাইটিস (Eosinophilic Gastritis): এক্ষেত্রে পাকস্থলীর আবরণে
ইওসিনোফিল নামক অ্যালার্জির সাথে সম্পর্কিত এক ধরনের শ্বেত রক্তকণিকা জমা হয়। এটি সাধারণত খাবার অ্যালার্জির সাথে যুক্ত।
(চ) গ্রানুলোমেটাস গ্যাস্ট্রাইটিস (Granulomatous Gastritis): এটিও একটি বিরল প্রকার,
যেখানে পাকস্থলীর আবরণে গ্রানুলোমা (ছোট ছোট প্রদাহজনক কোষের সমষ্টি) তৈরি হয়। এটি ক্রোনস ডিজিজ, সারকয়ডোসিস,
যক্ষ্মা বা কিছু ছত্রাক সংক্রমণের কারণে হতে পারে।
গ্যাস্ট্রিক নির্ণয়ের জন্য ডাক্তার সাধারণত রোগীর লক্ষণগুলো শোনেন, শারীরিক পরীক্ষা করেন এবং প্রয়োজনে কিছু পরীক্ষা করাতে পারেন:
(১) H. pylori পরীক্ষা: রক্ত, শ্বাস, বা মল পরীক্ষার মাধ্যমে H. pylori সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়।
(২) এন্ডোস্কোপি ও বায়োপসি: একটি পাতলা, নমনীয় টিউব (এন্ডোস্কোপ) মুখের মাধ্যমে পাকস্থলীতে প্রবেশ করানো হয়
এবং পাকস্থলীর আবরণ সরাসরি দেখা হয়। প্রয়োজনে বায়োপসি (টিস্যুর নমুনা) নিয়ে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করা হয়।
(৩) বেরিয়াম সোয়ালো (Barium Swallow): এটি একটি এক্স-রে পরীক্ষা যেখানে রোগীকে বেরিয়ামযুক্ত তরল পান করতে
দেওয়া হয়, যা পাকস্থলীকে এক্স-রেতে দৃশ্যমান করে তোলে। চিকিৎসা গ্যাস্ট্রিকের কারণের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে:
(৪) অ্যান্টাসিড (Antacids) বা অ্যাসিড কমানোর ঔষধ: যেমন প্রোটন পাম্প ইনহিবিটরস (PPIs) বা H2 ব্লকার।
(৫) অ্যান্টিবায়োটিক: যদি H. pylori সংক্রমণ থাকে।
(৬) জীবনযাত্রার পরিবর্তন: অ্যালকোহল ও NSAIDs এড়িয়ে চলা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা।
(৭) ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট: যদি পুষ্টি উপাদানের অভাব হয় (যেমন ভিটামিন বি১২)। গ্যাস্ট্রিক একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা, তবে
এর কারণ ও ধরন অনেক ভিন্ন হতে পারে। সঠিক রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করা জটিলতা এড়ানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।