+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিস (Acute Gastritis)

তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিস (Acute Gastritis) হলো পাকস্থলীর ভেতরের আবরণে (মিউকোসা) হঠাৎ এবং গুরুতর প্রদাহ। এটি সাধারণত অল্প সময়ের জন্য স্থায়ী হয় এবং এর লক্ষণগুলো দ্রুত দেখা দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে বা বারবার হতে থাকলে এটি দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিসে পরিণত হতে পারে।


তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিস কী?

পাকস্থলীর ভেতরের আবরণটি একটি পাতলা শ্লেষ্মা স্তর দ্বারা সুরক্ষিত থাকে, যা পাকস্থলীর অ্যাসিড এবং হজমকারী এনজাইমগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে এটিকে রক্ষা করে। যখন এই প্রতিরক্ষামূলক স্তরটি দুর্বল হয়ে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন পাকস্থলীর অ্যাসিড আবরণের সংস্পর্শে আসে এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে। তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিসের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি হঠাৎ করে ঘটে এবং প্রদাহ গুরুতর আকার ধারণ করে।

তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিসের কারণসমূহ

তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিসের অনেকগুলো সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো:

১. নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস (NSAIDs) এর ব্যবহার:

অ্যাসপিরিন (Aspirin), আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen), নেপ্রোক্সেন (Naproxen)-এর মতো ব্যথানাশক ঔষধগুলো পাকস্থলীর প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন (prostaglandins) নামক রাসায়নিক পদার্থের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন পাকস্থলীর শ্লেষ্মা স্তরকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এর অভাবে পাকস্থলীর আবরণ অ্যাসিডের ক্ষতিকর প্রভাবের জন্য আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, ফলে প্রদাহ হয়। দীর্ঘমেয়াদী বা অতিরিক্ত ব্যবহারে এটি আরও গুরুতর হতে পারে।

২. অ্যালকোহল সেবন:

অতিরিক্ত পরিমাণে অ্যালকোহল সেবন করলে পাকস্থলীর আবরণে সরাসরি জ্বালাপোড়া সৃষ্টি হয় এবং এটি শ্লেষ্মা স্তরকে দুর্বল করে দেয়, যা গ্যাস্ট্রাইটিসের দিকে পরিচালিত করে।

৩. মানসিক চাপ (Stress):

গুরুতর শারীরিক মানসিক চাপ, যেমন বড় ধরনের আঘাত, ব্যাপক পোড়া, গুরুতর অসুস্থতা (যেমন সেপসিস), বা বড় কোনো অস্ত্রোপচারের পর পাকস্থলীতে রক্ত প্রবাহ কমে যেতে পারে এবং অ্যাসিড উৎপাদন বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে পাকস্থলীর আবরণ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্ট্রেস আলসার (Stress Ulcer) বা তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিস হতে পারে।

৪. ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ (Helicobacter pylori - H. pylori):

যদিও H. pylori সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিসের প্রধান কারণ, তবে এর তীব্র সংক্রমণের কারণেও হঠাৎ করে গুরুতর প্রদাহ হতে পারে। এটি পাকস্থলীর আবরণে সরাসরি আক্রমণ করে প্রদাহ সৃষ্টি করে।

(৫) ভাইরাল সংক্রমণ:

কিছু ভাইরাস, যেমন সাইটোমেগালোভাইরাস (Cytomegalovirus - CMV) বা হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস (Herpes Simplex Virus - HSV), বিশেষ করে দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিস ঘটাতে পারে।

(৬) খাদ্য বিষক্রিয়া (Food Poisoning):

দূষিত খাবার বা ব্যাকটেরিয়াল টক্সিনের কারণেও পাকস্থলীতে হঠাৎ প্রদাহ হতে পারে, যা তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিসের লক্ষণ সৃষ্টি করে।

৭. কস্টিক বা ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শ:

ভুলবশত অ্যাসিড, ক্ষার বা অন্যান্য ক্ষয়কারী রাসায়নিক পদার্থ পান করলে পাকস্থলীর আবরণে গুরুতর রাসায়নিক পোড়া এবং তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি হয়।

৮. অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া (Autoimmune Reaction):

কিছু বিরল ক্ষেত্রে, শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত পাকস্থলীর কোষগুলোকে আক্রমণ করলে হঠাৎ করে প্রদাহ হতে পারে।

৯. রেডিয়েশন থেরাপি:

পেটের অংশে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য রেডিয়েশন থেরাপি ব্যবহার করা হলে পাকস্থলীর আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তীব্র প্রদাহ হতে পারে।

তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিসের লক্ষণসমূহ

তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিসের লক্ষণগুলো সাধারণত হঠাৎ এবং তীব্রভাবে প্রকাশ পায়। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:

(১) উপরের পেটে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া: এটি সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। ব্যথা সাধারণত পেটের উপরের অংশে, বুকের হাড়ের নিচে বা নাভির উপরের দিকে অনুভূত হয়।
(২) বমি বমি ভাব ও বমি: বিশেষ করে খাওয়ার পর এই লক্ষণগুলো বাড়তে পারে। বমিতে রক্তও থাকতে পারে (কফির গুঁড়োর মতো বা উজ্জ্বল লাল)।
(৩) ক্ষুধা কমে যাওয়া: পাকস্থলীর অস্বস্তির কারণে খাওয়ার আগ্রহ কমে যায়।
(৪) পেট ফাঁপা বা ভরা লাগা: অল্প খেলেও পেট ভরা লাগতে পারে বা পেট ফুলে যেতে পারে।
(৫) অম্বল বা বুক জ্বালাপোড়া (Heartburn): পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালীতে ফিরে এলে এই অনুভূতি হয়।
(৬) কালো বা আলকাতরার মতো মল (Melena): যদি পাকস্থলী থেকে রক্তপাত হয়, তবে রক্ত হজম হয়ে কালো রঙের মল তৈরি হতে পারে। এটি একটি গুরুতর লক্ষণ এবং দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন।
(৭) রক্ত বমি (Hematemesis): বমির সাথে উজ্জ্বল লাল রক্ত বা কফির গুঁড়োর মতো পদার্থ বের হতে পারে। এটিও একটি জরুরি অবস্থা।

তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিসের রোগ নির্ণয়

তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিস নির্ণয়ের জন্য ডাক্তার নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারেন:

(১) শারীরিক পরীক্ষা ও লক্ষণ পর্যালোচনা: রোগীর উপসর্গ এবং ঔষধের ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়।
(২) H. pylori পরীক্ষা: শ্বাস পরীক্ষা, মল পরীক্ষা বা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।
(৩) এন্ডোস্কোপি ও বায়োপসি: একটি পাতলা, নমনীয় টিউব (এন্ডোস্কোপ) মুখের মাধ্যমে পাকস্থলী পর্যন্ত প্রবেশ করানো হয়। এর সাহায্যে পাকস্থলীর আবরণ সরাসরি দেখা যায় এবং প্রয়োজনে টিস্যুর ছোট নমুনা (বায়োপসি) সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করা হয়। এটি প্রদাহের মাত্রা এবং কারণ নির্ণয়ে সবচেয়ে কার্যকর।
(৪) রক্ত পরীক্ষা: রক্তস্বল্পতা বা সংক্রমণের লক্ষণ পরীক্ষা করার জন্য করা হতে পারে।
(৫) মল পরীক্ষা: মলে রক্ত আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য করা হয়।

তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিসের চিকিৎসা

তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিসের চিকিৎসা মূলত এর অন্তর্নিহিত কারণের ওপর নির্ভর করে।

১. কারণ অপসারণ:
(ক) NSAIDs বা অ্যালকোহল সেবন বন্ধ করা।
(খ) মানসিক চাপ কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া।

১. অ্যাসিড কমানোর ঔষধ:

(ক) প্রোটন পাম্প ইনহিবিটরস (PPIs): যেমন ওমিপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল, ল্যান্সোপ্রাজল। এই ঔষধগুলো পাকস্থলীর অ্যাসিড উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যা আবরণের প্রদাহ সারাতে সাহায্য করে।
(খ) H2 ব্লকার: যেমন রেনিটিডিন, ফ্যামোটিডিন। এগুলোও অ্যাসিড উৎপাদন কমায়।
(গ) অ্যান্টাসিড (Antacids): তাৎক্ষণিক অ্যাসিড নিরপেক্ষ করতে সাহায্য করে।

২. অ্যান্টিবায়োটিক:

(ক) যদি H. pylori সংক্রমণ থাকে, তবে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের একটি কোর্স (সাধারণত একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের মিশ্রণ) দেওয়া হয়।

৩. জীবনযাত্রার পরিবর্তন:

(ক) ঝাল, চর্বিযুক্ত এবং মশলাদার খাবার এড়িয়ে চলা।
(খ) ছোট ছোট খাবার বারে বারে খাওয়া।
(গ) ধূমপান ত্যাগ করা।
(ঘ) পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া।
(ঙ) হাইড্রেশন বজায় রাখা (পর্যাপ্ত পানি পান করা)। তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিস সাধারণত স্বল্পমেয়াদী হলেও, এর লক্ষণগুলো তীব্র হতে পারে এবং যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা হয় তবে এটি গ্যাস্ট্রিক আলসার বা অন্যান্য জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।