গ্যাস্ট্রাইটিস, অর্থাৎ পাকস্থলীর ভেতরের আবরণে প্রদাহ, বিভিন্ন কারণে হতে পারে এবং এর তীব্রতা ও স্থায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে এটিকে তীব্র (Acute) বা দীর্ঘস্থায়ী (Chronic) গ্যাস্ট্রাইটিস হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। তবে, কারণ ও বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে আরও কিছু বিশেষ ধরনের গ্যাস্ট্রাইটিস রয়েছে, যা তাদের নির্দিষ্ট প্যাথলজি বা লক্ষণের জন্য পরিচিত। নিচে এই বিশেষ ধরনের গ্যাস্ট্রাইটিসগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
অ্যাট্রোফিক গ্যাস্ট্রাইটিস হলো দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিসের একটি গুরুতর রূপ, যেখানে পাকস্থলীর ভেতরের আবরণ (মিউকোসা) এতটাই পাতলা হয়ে যায় যে, এটি অ্যাসিড এবং হজমকারী এনজাইম উৎপাদনকারী গ্রন্থিগুলো হারিয়ে ফেলে। এর ফলে হজম প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের অভাব দেখা দিতে পারে।
(১) দীর্ঘমেয়াদী হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি (H. pylori) সংক্রমণ: এটি সবচেয়ে সাধারণ কারণ।
দীর্ঘ সময় ধরে H. pylori সংক্রমণ চলতে থাকলে পাকস্থলীর আবরণে ক্রমান্বয়ে অ্যাট্রোফি দেখা দেয়।
২ অটোইমিউন গ্যাস্ট্রাইটিস:
শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন ভুলবশত পাকস্থলীর প্যারাইটাল কোষগুলোকে (যেগুলো অ্যাসিড এবং ভিটামিন বি১২
শোষণের জন্য প্রয়োজনীয় ইন্ট্রিনসিক ফ্যাক্টর তৈরি করে) আক্রমণ করে, তখন অ্যাট্রোফিক গ্যাস্ট্রাইটিস হয়। এটি পারনিসিয়াস
অ্যানিমিয়া (Pernicious Anemia) নামক রক্তস্বল্পতার একটি প্রধান কারণ, কারণ ইন্ট্রিনসিক ফ্যাক্টরের
অভাবে ভিটামিন বি১২ শোষিত হতে পারে না।
প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ নাও থাকতে পারে।
(ক) ভিটামিন বি১২ এর অভাবজনিত লক্ষণ: ক্লান্তি, দুর্বলতা, ফ্যাকাশে ত্বক, জিহ্বায় জ্বালাপোড়া, হাত-পায়ে ঝিনঝিন করা বা অসাড়তা (নিউরোপ্যাথি)।
(খ) বদহজম, পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া।
(গ) লৌহঘটিত রক্তস্বল্পতা (Iron deficiency anemia)।
গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে ইন্টেস্টাইনাল মেটাপ্লাসিয়া (কোষের ধরন পরিবর্তন) দেখা দিলে।
ইরোসিভ গ্যাস্ট্রাইটিস এমন এক ধরনের গ্যাস্ট্রাইটিস যেখানে পাকস্থলীর ভেতরের আবরণে ক্ষয় (erosion) বা আলসার (ক্ষত) তৈরি হয়। এই ক্ষয়গুলো পাকস্থলীর আবরণের উপরের স্তরকে প্রভাবিত করে এবং এর ফলে রক্তপাত হতে পারে। এটি তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী উভয়ই হতে পারে।
(ক) নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস (NSAIDs) এর অতিরিক্ত ব্যবহার:
অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন, নেপ্রোক্সেনের মতো ঔষধের কারণে এটি প্রায়শই ঘটে।
(খ) অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন: পাকস্থলীর আবরণে সরাসরি জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে।
(গ) তীব্র মানসিক চাপ (Severe Stress): বড় আঘাত, পোড়া বা গুরুতর অসুস্থতার কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপ থেকে স্ট্রেস আলসার ও ইরোশন হতে পারে।
(ঘ) কস্টিক পদার্থ: ভুলবশত অ্যাসিড বা ক্ষারযুক্ত পদার্থ পান করলে।
(ঙ) পিত্ত রিফ্লাক্স: পিত্তরস পাকস্থলীতে ফিরে এলে।
(চ) তেজস্ক্রিয়তা (Radiation): পেটে রেডিয়েশন থেরাপির কারণে।
(ক) উপরের পেটে তীব্র ব্যথা বা জ্বালাপোড়া।
(খ) বমি বমি ভাব ও বমি (কখনও বমির সাথে রক্ত, যা কফির গুঁড়োর মতো দেখতে হতে পারে)।
(গ) কালো বা আলকাতরার মতো মল (Melena), যা রক্তপাতের ইঙ্গিত দেয়।
(ঘ) রক্তস্বল্পতা (যদি দীর্ঘমেয়াদী রক্তপাত হয়)।
নন-ইরোসিভ গ্যাস্ট্রাইটিস হলো পাকস্থলীর আবরণের প্রদাহ, যেখানে এন্ডোস্কোপিতে কোনো সুস্পষ্ট ক্ষয় বা আলসার দেখা যায় না। সাধারণত হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল (টিস্যু পরীক্ষা) পরীক্ষার মাধ্যমে প্রদাহ নিশ্চিত করা হয়।
(ক) হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি (H. pylori) সংক্রমণ: এটি নন-ইরোসিভ গ্যাস্ট্রাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ কারণ।
(খ) যদিও প্রদাহ থাকে, তবে পাকস্থলীর আস্তরণে সরাসরি কোনো ক্ষত থাকে না, যা এটিকে ইরোসিভ গ্যাস্ট্রাইটিস থেকে আলাদা করে।
(ক) পেটে হালকা ব্যথা বা অস্বস্তি।
(খ) পেট ফাঁপা।
(গ) বদহজম।
(ঘ) বমি বমি ভাব।
(ঙ) অনেক সময় কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে।
লিম্ফোসাইটিক গ্যাস্ট্রাইটিস একটি বিরল ধরনের গ্যাস্ট্রাইটিস, যেখানে পাকস্থলীর আবরণে লিম্ফোসাইট (lymphocytes) নামক এক ধরনের শ্বেত রক্তকণিকার অস্বাভাবিক জমাট বাঁধে।
(ক) এই ধরনের গ্যাস্ট্রাইটিসের সঠিক কারণ প্রায়শই অজানা থাকে।
(খ) তবে, কিছু ক্ষেত্রে এটি সিরেয়াক ডিজিজ (Celiac Disease), H. pylori সংক্রমণ বা কিছু ঔষধের প্রতিক্রিয়ার সাথে যুক্ত হতে পারে।
(ক) বমি বমি ভাব, বমি।
(খ) উপরের পেটে ব্যথা।
(গ) ক্ষুধা মন্দা।
(ঘ) কিছু ক্ষেত্রে ছোট ছোট নোডিউল বা পলিপের মতো গঠন দেখা যেতে পারে।
ইওসিনোফিলিক গ্যাস্ট্রাইটিস এমন এক ধরনের প্রদাহ যেখানে পাকস্থলীর আবরণে ইওসিনোফিল (eosinophils) নামক অ্যালার্জির সাথে সম্পর্কিত শ্বেত রক্তকণিকার অস্বাভাবিক জমাট বাঁধে। এটি গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ইওসিনোফিলিক ডিসঅর্ডার (EGID) এর একটি অংশ।
(ক) এটি প্রায়শই খাবার অ্যালার্জি (Food Allergies), অ্যাজমা, বা অন্যান্য অ্যালার্জিক অবস্থার সাথে যুক্ত।
(খ) দুধ, সয়া, ডিম, গম এবং সামুদ্রিক খাবার এর ট্রিগার হতে পারে।
(ক) পেটে ব্যথা।
(খ) বমি বমি ভাব ও বমি।
(গ) খাওয়ার পর পেট ভরে যাওয়া বা ফোলা।
(ঘ) রক্তস্বল্পতা।
(ঙ) শিশুদের মধ্যে ওজন কমে যাওয়া বা বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া।
গ্রানুলোমেটাস গ্যাস্ট্রাইটিস একটি বিরল ধরনের গ্যাস্ট্রাইটিস, যেখানে পাকস্থলীর আবরণে গ্রানুলোমা (granulomas) নামক প্রদাহজনক কোষের সমষ্টি তৈরি হয়।
এটি বিভিন্ন অন্তর্নিহিত রোগের কারণে হতে পারে:
(ক) ক্রোনস ডিজিজ (Crohn's Disease): এটি প্রদাহজনক আন্ত্রিক রোগ যা পরিপাকতন্ত্রের যেকোনো অংশকে প্রভাবিত করতে পারে।
(খ) সারকয়ডোসিস (Sarcoidosis): এটি একটি পদ্ধতিগত রোগ যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে গ্রানুলোমা তৈরি করে।
(গ) যক্ষ্মা (Tuberculosis): টিবি ব্যাকটেরিয়া পাকস্থলীতে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
(ঘ) কিছু ধরনের ফাঙ্গাল সংক্রমণ (Fungal Infections)।
(ঙ) কিছু ক্ষেত্রে কারণ অজানা থাকতে পারে।
(ক) পেটে ব্যথা।
(খ) বমি বমি ভাব ও বমি।
(গ) ওজন কমে যাওয়া।
(ঘ) বদহজম। এই বিশেষ ধরনের গ্যাস্ট্রাইটিসগুলো নির্ণয় করার জন্য প্রায়শই এন্ডোস্কোপি এবং বায়োপসি জরুরি হয়, কারণ কেবলমাত্র টিস্যু পরীক্ষার মাধ্যমেই এই ধরনের প্রদাহের সঠিক ধরন এবং কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব। চিকিৎসা পদ্ধতিও প্রতিটি নির্দিষ্ট ধরনের গ্যাস্ট্রাইটিসের অন্তর্নিহিত কারণের ওপর নির্ভর করে।