গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস (Glomerulonephritis - GN) হলো কিডনির ক্ষুদ্র ফিল্টারিং ইউনিট, যা গ্লোমেরুলি (Glomeruli) নামে পরিচিত, সেগুলোর প্রদাহ। এই প্রদাহ বিভিন্ন কারণে হতে পারে এবং এটি কিডনির কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা:
কিডনিতে প্রায় ১০ লাখ ক্ষুদ্র ফিল্টারিং ইউনিট থাকে, যাদেরকে নেফ্রন (Nephron) বলা হয়। প্রতিটি নেফ্রনের শুরুতে একটি ছোট জালিকার মতো রক্তনালীর গুচ্ছ থাকে, যাকে গ্লোমেরুলাস (Glomerulus) (বহুবচনে গ্লোমেরুলি) বলা হয়। এই গ্লোমেরুলি হলো কিডনির প্রধান ফিল্টার, যা রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ, অতিরিক্ত তরল এবং টক্সিন ছেঁকে প্রস্রাব তৈরি করে। একই সাথে, এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন এবং রক্তকণিকাকে শরীরে ধরে রাখে।
যখন গ্লোমেরুলিতে প্রদাহ হয়, তখন সেগুলোর ছাঁকনি ক্ষমতা ব্যাহত হয়। এর ফলে রক্তে বর্জ্য পদার্থ জমা হতে শুরু করে এবং প্রস্রাবের মাধ্যমে প্রোটিন ও রক্তকণিকা বেরিয়ে যেতে পারে। এটি কিডনির কার্যকারিতা ধীরে ধীরে হ্রাস করে এবং যদি চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বা কিডনি ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিসকে দুটি প্রধান প্রকারে ভাগ করা যায়:>
(১) তীব্র গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস (Acute Glomerulonephritis): (ক) এটি হঠাৎ করে শুরু হয় এবং এর
লক্ষণগুলো দ্রুত দেখা দেয়। (খ) এটি প্রায়শই কোনো সংক্রমণ (যেমন স্ট্রেপ থ্রোট বা ইম্পেটিগো) বা অন্য কোনো রোগের পরে ঘটে।
(গ) সঠিক চিকিৎসায় এটি সম্পূর্ণরূপে সেরে যেতে পারে, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
(২) দীর্ঘস্থায়ী গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস (Chronic Glomerulonephritis): (ক) এটি ধীরে ধীরে বিকশিত হয় এবং
দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। (খ) প্রাথমিকভাবে এর কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে এবং কিডনির ক্ষতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
(গ) এটি সাধারণত কোনো অন্তর্নিহিত রোগের জটিলতা হিসেবে দেখা দেয় এবং প্রায়শই কিডনি ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যায়।
(১) সংক্রমণ (Infections):
(ক) পোস্ট-স্ট্রেপ্টোকক্কাল গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস (Post-streptococcal Glomerulonephritis - PSGN):
এটি বাচ্চাদের এবং তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কারণ। স্ট্রেপ্টোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার (যা গলা ব্যথা বা ত্বকের সংক্রমণ ঘটায়)
সংক্রমণের ২-৩ সপ্তাহ পরে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত কিডনির গ্লোমেরুলি আক্রমণ করে।
(খ) ব্যাকটেরিয়াল এন্ডোকার্ডাইটিস (Bacterial Endocarditis): হৃদপিণ্ডের ভাল্বের সংক্রমণ।
(গ) ভাইরাল সংক্রমণ: হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, এইচআইভি।
(২) স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধক রোগ (Autoimmune Diseases):
এই রোগগুলোতে শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আক্রমণ করে।
(ক) লুপাস (Systemic Lupus Erythematosus - SLE): একটি পদ্ধতিগত অটোইমিউন রোগ যা
কিডনি সহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে।
(খ) গুডপাসচার সিন্ড্রোম (Goodpasture Syndrome): এটি একটি বিরল অটোইমিউন রোগ যা কিডনি এবং
ফুসফুস উভয়কেই আক্রমণ করে।
(গ) আইজিএ নেফ্রোপ্যাথি (IgA Nephropathy / Berger's Disease): এটি একটি সাধারণ ধরনের
গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস যেখানে ইমিউনোগ্লোবুলিন এ (IgA) নামক অ্যান্টিবডি কিডনির গ্লোমেরুলিতে জমা হয়। এটি প্রায়শই শ্বাসযন্ত্র
বা হজমতন্ত্রের সংক্রমণের পরে দেখা দেয়।
(ঘ) ভাসকুলারাইটিস (Vasculitis): রক্তনালীর প্রদাহ, যেমন ওয়েগেনার্স গ্রানুলোম্যাটোসিস (Wegener's
Granulomatosis) বা মাইক্রোস্কোপিক পলিঅ্যাঞ্জাইটিস (Microscopic Polyangiitis)।
(৩) জেনেটিক্স (Genetics):
কিছু ক্ষেত্রে, গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস জেনেটিক কারণের সাথে যুক্ত হতে পারে,
যেমন অ্যালপোর্ট সিন্ড্রোম (Alport Syndrome)।
(৪) অন্যান্য কারণ:
(ক) উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure): দীর্ঘস্থায়ী অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ক্ষতি করতে পারে।
(খ) ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি (Diabetic Nephropathy): ডায়াবেটিস কিডনির ছোট রক্তনালীগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে,
যা গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিসের একটি সাধারণ কারণ।
(গ) কিছু ওষুধ: কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ কিডনির ক্ষতি করতে পারে।
লক্ষণগুলো তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিসের প্রকারভেদের উপর নির্ভর করে।
তীব্র গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিসের লক্ষণ-
(ক) প্রস্রাবের রঙের পরিবর্তন: প্রস্রাব লাল বা বাদামী (কোকা-কোলার মতো) হতে পারে, যা প্রস্রাবে রক্তের উপস্থিতি (hematuria) নির্দেশ করে।
(খ) ফোলাভাব (Edema): বিশেষ করে মুখ, চোখ, হাত ও পায়ে ফোলাভাব দেখা দেয়, কারণ কিডনি অতিরিক্ত তরল বের করতে পারে না।
(গ) উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure):
(ঘ) ঘন ঘন প্রস্রাব করার তাগিদ:
(ঙ) পেশী ব্যথা এবং জয়েন্টে ব্যথা:
(চ) মাথাব্যথা:
(ছ) সাধারণ ক্লান্তি ও দুর্বলতা:
(জ) প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া (Oliguria):
দীর্ঘস্থায়ী গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস বহু বছর ধরে কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। যখন লক্ষণ দেখা দেয়, তখন সেগুলো সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের লক্ষণ:
(ক) প্রস্রাবে প্রোটিন (Proteinuria): প্রস্রাবে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন বের হয়ে যাওয়ায় প্রস্রাব ফেনা ফেনা হতে পারে।
(খ) সাধারণ ফোলাভাব: বিশেষ করে পায়ে ও গোড়ালিতে।
(গ) উচ্চ রক্তচাপ: যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
(ঘ) ক্লান্তি, দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা:
(ঙ) বমি বমি ভাব ও বমি:
(চ) রাতে পেশী টান (Muscle Cramps):
(ছ) ত্বকের শুষ্কতা ও চুলকানি:
(জ) ঘন ঘন প্রস্রাব করার প্রয়োজন, বিশেষ করে রাতে (Nocturia):
(ঝ) রক্তস্বল্পতা (Anemia):
গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়:
(ক) মূত্র পরীক্ষা (Urinalysis):( প্রস্রাবে রক্তকণিকা (RBC casts),
প্রোটিন এবং অন্যান্য অস্বাভাবিকতা দেখা হয়।
(গ) রক্ত পরীক্ষা (Blood Tests):
(ঘ) কিডনির কার্যকারিতা: ক্রিয়েটিনিন (Creatinine) এবং ব্লাড ইউরিয়া নাইট্রোজেন (BUN) এর মাত্রা বেড়ে যাওয়া কিডনির কার্যকারিতা হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়।
(ঙ) ইমিউনোলজিক্যাল পরীক্ষা: অ্যান্টিবডি (যেমন ANA, ANCA, Anti-GBM) এবং কমপ্লিমেন্ট লেভেল (C3, C4)
পরিমাপ করা হয় যা অটোইমিউন রোগের কারণ হতে পারে।
(চ) অন্যান্য চিহ্নিতকারী: ASLO টাইটার (যদি স্ট্রেপ্টোকক্কাল সংক্রমণের সন্দেহ হয়), হেপাটাইটিস প্যানেল।
(ছ) কিডনি বায়োপসি (Kidney Biopsy): এটি গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিসের সঠিক ধরণ এবং তীব্রতা নির্ণয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
কিডনি থেকে টিস্যুর একটি ছোট নমুনা নিয়ে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করা হয়।
(জ) ইমেজিং পরীক্ষা: আল্ট্রাসাউন্ড বা সিটি স্ক্যান কিডনির আকার এবং গঠনে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কিনা তা দেখতে সাহায্য করতে পারে।
গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিসের চিকিৎসা নির্ভর করে এর কারণ, ধরণ এবং তীব্রতার উপর।
(১) অন্তর্নিহিত কারণের চিকিৎসা:
(ক) সংক্রমণ:
অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে স্ট্রেপ্টোকক্কাল সংক্রমণের চিকিৎসা।
(খ) অটোইমিউন রোগ: ইমিউনোসাপ্রেসিভ ড্রাগস (যেমন কর্টিকোস্টেরয়েড, সাইক্লোফসফামাইড, মাইকোফেনোলেট মোফেটিল)
ব্যবহার করে প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া দমন করা হয়।
(গ) উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস: এই অবস্থাগুলো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কিডনির আরও ক্ষতি রোধ করতে জরুরি।
(২) লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা (Symptomatic Treatment):
(ক) রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: ACE ইনহিবিটরস (ACE inhibitors) বা এআরবি (ARBs) এর মতো ওষুধ কিডনির উপর চাপ কমাতে এবং
প্রোটিন লিকেজ কমাতে সাহায্য করে।
(খ) ফোলাভাব নিয়ন্ত্রণ: ডাইউরেটিকস (Diuretics) অতিরিক্ত তরল বের করে ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করে।
(গ) কম প্রোটিন ও কম লবণ যুক্ত খাদ্য: এটি কিডনির উপর চাপ কমাতে সাহায্য করে।
(ঘ) রক্তাল্পতার চিকিৎসা: প্রয়োজন হলে আয়রন সাপ্লিমেন্ট বা ইরিথ্রোপোয়েটিন (Erythropoietin)।
(৩) প্লাজমাপেরেসিস (Plasmapheresis): কিছু গুরুতর অটোইমিউন গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিসের ক্ষেত্রে, রক্ত থেকে ক্ষতিকর
অ্যান্টিবডি অপসারণের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
(৪) কিডনি ব্যর্থতার চিকিৎসা: যদি কিডনির কার্যকারিতা গুরুতরভাবে হ্রাস পায়, তাহলে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।
গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা হয় বা রোগ গুরুতর হয়, তাহলে নিম্নলিখিত জটিলতা দেখা দিতে পারে:
(ক) তীব্র কিডনি ব্যর্থতা (Acute Kidney Failure): হঠাৎ করে কিডনির কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যাওয়া।
(খ) দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ (Chronic Kidney Disease - CKD): কিডনির কার্যকারিতা ধীরে ধীরে কমে যাওয়া।
(গ) শেষ পর্যায়ের কিডনি রোগ (End-Stage Renal Disease - ESRD): কিডনি সম্পূর্ণরূপে কাজ করা বন্ধ করে দেওয়া, যার জন্য ডায়ালাইসিস বা প্রতিস্থাপন অপরিহার্য।
(ঘ) উচ্চ রক্তচাপ: এটি নীরব ঘাতক, এটি ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেরমত কিডনির ক্ষতি করে।
(ঙ) নেফ্রোটিক সিন্ড্রোম (Nephrotic Syndrome): প্রস্রাবে প্রচুর প্রোটিন, রক্তে কম প্রোটিন, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং গুরুতর ফোলাভাব দ্বারা চিহ্নিত একটি অবস্থা। গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস একটি জটিল কিডনি রোগ এবং এর প্রাথমিক নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসা কিডনির ক্ষতি কমাতে এবং রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।