+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

কিডনি ক্যান্সার (Kidney Cancer):

কিডনি ক্যান্সার হলো কিডনির কোষে অস্বাভাবিক এবং অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা একটি টিউমার বা ভর তৈরি করে। এই অস্বাভাবিক কোষগুলি শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে (মেটাস্ট্যাসিস), যা এটিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। কিডনি ক্যান্সার বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে, তবে রেনাল সেল কার্সিনোমা (Renal Cell Carcinoma - RCC) সবচেয়ে সাধারণ এবং পরিচিত প্রকার।


১। রেনাল সেল কার্সিনোমা (Renal Cell Carcinoma - RCC):

রেনাল সেল কার্সিনোমা হলো প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ধরনের কিডনি ক্যান্সার, যা কিডনির ছোট ছোট টিউবুলগুলিতে (রক্ত ফিল্টার করে প্রস্রাব তৈরি করে এমন অংশ) শুরু হয়। প্রায় ৮৫% কিডনি ক্যান্সারই হলো আরসিসি।

২। আরসিসি-এর প্রকারভেদ:

রেনাল সেল কার্সিনোমার বিভিন্ন উপপ্রকার রয়েছে, যা কোষের চেহারা এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে:

(১) ক্লিয়ার সেল রেনাল সেল কার্সিনোমা (Clear Cell RCC): এটি আরসিসি-এর সবচেয়ে সাধারণ উপপ্রকার, যা প্রায় ৭০-৮০% ক্ষেত্রে দেখা যায়। এর কোষগুলি অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে "ক্লিয়ার" বা স্বচ্ছ দেখায়।
(২) প্যাপিলারি রেনাল সেল কার্সিনোমা (Papillary RCC): এটি প্রায় ১০-১৫% আরসিসি কেস গঠন করে এবং এর কোষগুলি আঙুলের মতো প্রজেকশন বা "প্যাপিলি" গঠন করে। এর দুটি প্রকার রয়েছে, টাইপ ১ এবং টাইপ ২।
(৩) ক্রোমোফোব রেনাল সেল কার্সিনোমা (Chromophobe RCC): এটি প্রায় ৫% ক্ষেত্রে দেখা যায় এবং এর কোষগুলি অন্যান্য প্রকারের থেকে ভিন্ন দেখায়।
(৪) কালেক্টিং ডাক্ট কার্সিনোমা (Collecting Duct Carcinoma): এটি একটি বিরল এবং আক্রমণাত্মক প্রকার, যা কিডনির কালেক্টিং ডাক্টে শুরু হয়
(৫) আনক্লাসিফায়েড রেনাল সেল কার্সিনোমা (Unclassified RCC): যখন ক্যান্সার কোষগুলি উপরের কোনো প্রকারের সাথে মেলে না, তখন এটিকে আনক্লাসিফায়েড বলা হয়।

৩। কিডনি ক্যান্সারের কারণ ও ঝুঁকির কারণসমূহ:

কিডনি ক্যান্সারের সঠিক কারণ প্রায়শই অজানা থাকে, তবে কিছু ঝুঁকির কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:

(১) ধূমপান: ধূমপান কিডনি ক্যান্সারের ঝুঁকিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।
(২) স্থূলতা: অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা কিডনি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
(৩) উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন): অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনি ক্যান্সারের একটি ঝুঁকির কারণ।
(৪) নির্দিষ্ট কিছু ঔষধের ব্যবহার: কিছু ব্যথানাশক ঔষধের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার কিডনির ক্ষতির কারণ হতে পারে।
(৫) দীর্ঘমেয়াদী ডায়ালাইসিস: যারা দীর্ঘ সময় ধরে কিডনি ফেইলিউরের জন্য ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন, তাদের কিডনি ক্যান্সারের ঝুঁকি কিছুটা বেশি।
(৬) বংশগত কারণ এবং জিনগত সিন্ড্রোম: কিছু জিনগত রোগ কিডনি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, যেমন-
(ক) ভন হিপেল-লিন্ডাউ ডিজিজ (Von Hippel-Lindau - VHL disease): এটি কিডনিতে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে টিউমার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
(খ) বার্থ-হগ-ডুব সিন্ড্রোম (Birt-Hogg-Dubé syndrome): এটি কিডনি, ত্বক এবং ফুসফুসে টিউমার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
(গ) হেরিডিটারি প্যাপিলারি রেনাল সেল কার্সিনোমা (Hereditary Papillary Renal Cell Carcinoma): এটি এক প্রকার প্যাপিলারি আরসিসি যা পরিবারে প্রবাহিত হয়।
(৭) শিল্প রাসায়নিকের সংস্পর্শ: কিছু রাসায়নিক, যেমন ক্যাডমিয়াম বা ট্রাইক্লোরোইথিলিন, কিডনি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
(৮) বয়স: কিডনি ক্যান্সারের ঝুঁকি বয়সের সাথে বাড়ে, সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।
(৯) লিঙ্গ: পুরুষদের মধ্যে কিডনি ক্যান্সার মহিলাদের চেয়ে বেশি সাধারণ।

৪। কিডনি ক্যান্সারের লক্ষণসমূহ

প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি ক্যান্সারের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে। অনেক সময় এটি অন্য কোনো কারণে করা ইমেজিং পরীক্ষার (যেমন আল্ট্রাসাউন্ড বা সিটি স্ক্যান) সময় অপ্রত্যাশিতভাবে ধরা পড়ে। তবে, রোগ বাড়ার সাথে সাথে যে লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে:

(১) প্রস্রাবে রক্ত (Hematuria): এটি কিডনি ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। রক্ত হালকা গোলাপী থেকে গাঢ় লাল বা বাদামী হতে পারে। এটি অবিরাম বা বিরতি দিয়ে দেখা যেতে পারে।
(২) পিঠ বা পাশে ব্যথা: সাধারণত কোমরের কাছাকাছি, একপাশে অবিরাম বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা যা কোনো আঘাতের কারণে নয়।
(৩) পেটে বা পাশে চাকা বা পিণ্ড (Lump or Mass): কিডনির আশেপাশে palpable একটি চাকা অনুভব করা যেতে পারে।
(৪) অ unexplained ওজন হ্রাস: কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া।
(৫) জ্বর: দীর্ঘস্থায়ী জ্বর যা সংক্রমণের কারণে নয়।
(৬) ক্লান্তি: অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং দুর্বলতা।
(৭) রক্তাল্পতা (Anemia): রক্তের লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা কমে যাওয়া।
(৮) উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension): অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ।
(৯) প্যারা-নওপ্লাস্টিক সিন্ড্রোম (Paraneoplastic Syndromes): কিছু ক্ষেত্রে কিডনি ক্যান্সার এমন পদার্থ তৈরি করে যা শরীরের অন্যান্য অংশে সমস্যা সৃষ্টি করে, যেমন:
(ক) উচ্চ রক্তে ক্যালসিয়াম (Hypercalcemia)।
(খ) লাল রক্তকণিকার সংখ্যা বৃদ্ধি (Polycythemia) ।
(গ) যকৃতের কার্যকারিতার অস্বাভাবিকতা।

৫। রোগ নির্ণয়:

কিডনি ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়:

(১) শারীরিক পরীক্ষা ও ইতিহাস: রোগীর লক্ষণ, স্বাস্থ্যগত ইতিহাস এবং পারিবারিক ইতিহাস পর্যালোচনা করা হয়।
(২) প্রস্রাব পরীক্ষা (Urinalysis): প্রস্রাবে রক্ত বা অন্যান্য অস্বাভাবিকতা পরীক্ষা করা হয়।
(৩) রক্ত পরীক্ষা: কিডনির কার্যকারিতা, রক্তাল্পতা বা অন্যান্য অস্বাভাবিকতা পরীক্ষা করা হয়।
(৪) ইমেজিং পরীক্ষা:
(ক) আল্ট্রাসাউন্ড (Ultrasound): কিডনিতে কোনো অস্বাভাবিকতা বা সিস্ট আছে কিনা তা দেখতে প্রাথমিক পরীক্ষা।
(খ) সিটি স্ক্যান (CT Scan): এটি কিডনির বিস্তারিত চিত্র দেয় এবং টিউমারের আকার, অবস্থান এবং এটি শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়েছে কিনা তা দেখতে সাহায্য করে।
(গ) এমআরআই (MRI): কিছু ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যানের বিকল্প হিসেবে বা আরও বিস্তারিত তথ্যের জন্য ব্যবহৃত হয়।
(ঘ) পিইটি স্ক্যান (PET Scan): ক্যান্সার শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়েছে কিনা তা দেখতে ব্যবহৃত হতে পারে।
(৫) বায়োপসি (Biopsy): সব ক্ষেত্রে প্রয়োজন না হলেও, কিছু পরিস্থিতিতে কিডনির টিউমার থেকে টিস্যুর একটি ছোট নমুনা নিয়ে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করে ক্যান্সার নিশ্চিত করা হয় এবং এর ধরন নির্ধারণ করা হয়।

৬। চিকিৎসা:

কিডনি ক্যান্সারের চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যান্সারের পর্যায় (স্টেজ), আকার, রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং ক্যান্সারের ধরন সহ বিভিন্ন কারণের ওপর। প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো:

(১) সার্জারি (Surgery): কিডনি ক্যান্সারের প্রধান চিকিৎসা হলো অস্ত্রোপচার।
(ক) নেফ্রেক্টোমি (Nephrectomy): কিডনির যে অংশে ক্যান্সার আছে (আংশিক নেফ্রেক্টোমি) বা সম্পূর্ণ কিডনি (র‍্যাডিক্যাল নেফ্রেক্টোমি) অপসারণ করা হয়।
(খ) ল্যাপারোস্কোপিক নেফ্রেক্টোমি (Laparoscopic Nephrectomy) বা রোবোটিক সার্জারি: এটি minimally invasive পদ্ধতি, যেখানে ছোট ছেদ করে অস্ত্রোপচার করা হয়, ফলে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।
(২) অ্যাবলেশন থেরাপি (Ablation Therapy): ছোট টিউমারের জন্য, বিশেষ করে যারা অস্ত্রোপচারের জন্য উপযুক্ত নন, তাদের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
(ক) রেডিওফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন (Radiofrequency Ablation - RFA): টিউমারকে উচ্চ তাপমাত্রার সাহায্যে ধ্বংস করা হয়।
(খ) ক্রায়োঅ্যাবলেশন (Cryoablation): টিউমারকে চরম ঠান্ডায় জমাট বাঁধিয়ে ধ্বংস করা হয়।
(১) টার্গেটেড থেরাপি (Targeted Therapy): এই ঔষধগুলি ক্যান্সারের কোষের নির্দিষ্ট অণুগুলিকে লক্ষ্য করে কাজ করে, যা ক্যান্সারের বৃদ্ধি এবং বিস্তারকে বাধা দেয়। এটি সাধারণত উন্নত পর্যায়ে বা মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারের জন্য ব্যবহৃত হয়।
(২) ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy): এই চিকিৎসা শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে ক্যান্সার কোষগুলির সাথে লড়াই করতে সাহায্য করে। এটি উন্নত কিডনি ক্যান্সারের চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
(৩) কেমোথেরাপি (Chemotherapy): কিডনি ক্যান্সার সাধারণত কেমোথেরাপিতে খুব বেশি সাড়া দেয় না, তাই এটি সাধারণত অন্যান্য চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে কম ব্যবহৃত হয়। তবে, কিছু বিরল প্রকারের জন্য এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
(৪) রেডিয়েশন থেরাপি (Radiation Therapy): এটি ক্যান্সার কোষগুলিকে ধ্বংস করতে উচ্চ-শক্তির বিকিরণ ব্যবহার করে। এটি সাধারণত কিডনি ক্যান্সারের প্রাথমিক চিকিৎসায় খুব কম ব্যবহৃত হয়, তবে এটি ব্যথা উপশম করতে বা ক্যান্সার যখন হাড় বা মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে তখন ব্যবহার করা যেতে পারে।
(৫) পর্যবেক্ষণ (Active Surveillance): খুব ছোট এবং ধীর-বর্ধমান টিউমারের জন্য, বিশেষ করে বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে, নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা না করে টিউমারের বৃদ্ধি নিরীক্ষণ করা হয়।
কিডনি ক্যান্সার একটি জটিল রোগ, এবং এর চিকিৎসা রোগীর ব্যক্তিগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে। প্রাথমিক সনাক্তকরণ এবং দ্রুত চিকিৎসা সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়ায়। যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।