+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

কিডনি ফেইলিউর (Kidney Failure):

কিডনি ফেইলিউর (Kidney Failure) বা কিডনি বিকল হওয়া বলতে কিডনির কার্যক্ষমতা সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়াকে বোঝায়। এটিকে এন্ড-স্টেজ রেনাল ডিজিজ (ESRD) ও বলা হয়। এই পর্যায়ে কিডনি শরীরের বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল অপসারণ করতে পারে না, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে বিভিন্ন গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয় এবং জীবনধারণের জন্য ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি প্রতিস্থাপন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা:


১। কিডনি ফেইলিউর (Kidney Failure) বা কিডনি বিকল কী?

আমাদের শরীরে দুটি কিডনি থাকে, যা রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ, অতিরিক্ত লবণ এবং জল ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। এছাড়াও, কিডনি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, লোহিত রক্তকণিকা তৈরি এবং হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন কিডনি ৫০% থেকে কম কাজ করে তখন তাকে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD) বলে। কিন্তু কিডনি ফেইলিউর বলতে বোঝায় যখন কিডনির কার্যক্ষমতা ১০-১৫% এর নিচে নেমে আসে। অর্থাৎ, কিডনি আর শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে পারে না।

২। এন্ড-স্টেজ রেনাল ডিজিজ (ESRD):

ESRD হলো কিডনি ফেইলিউরের চূড়ান্ত পর্যায়। এই পর্যায়ে কিডনির কার্যকারিতা এতটাই কমে যায় যে, এটি শরীরের প্রয়োজন মেটাতে সম্পূর্ণভাবে অক্ষম হয়ে পড়ে। এই অবস্থা সাধারণত ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD) এর ধীরে ধীরে অবনতির ফল। যখন একজন ব্যক্তি ESRD-তে পৌঁছান, তখন তার শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থগুলি জমা হতে শুরু করে, যা বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং জীবনযাত্রার মান গুরুতরভাবে হ্রাস করে।

৩। কিডনি ফেইলিউরের কারণ:

কিডনি ফেইলিউরের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যার মধ্যে প্রধান কিছু হলো:

(ক) ডায়াবেটিস: এটি কিডনি ফেইলিউরের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। উচ্চ রক্তে শর্করা কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

(খ) উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন): অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির রক্তনালীগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং তাদের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
(গ) গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস: কিডনির ছাঁকনি (গ্লোমেরুলি) এর প্রদাহ, যা বিভিন্ন কারণে হতে পারে।
(ঘ) পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ (PKD): এটি একটি বংশগত রোগ যেখানে কিডনিতে অসংখ্য সিস্ট (তরল ভর্তি থলি) তৈরি হয় এবং কিডনির স্বাভাবিক টিস্যুকে প্রতিস্থাপন করে।
(ঙ) কিডনিতে পাথর বা মূত্রনালীর বাধা: দীর্ঘস্থায়ী মূত্রনালীর বাধা, যেমন প্রস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি বা কিডনিতে পাথর, কিডনির ক্ষতি করতে পারে।
(চ) কিছু নির্দিষ্ট ঔষধের অপব্যবহার: কিছু ব্যথানাশক ঔষধ বা অন্যান্য ঔষধের দীর্ঘমেয়াদী ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কিডনির ক্ষতি করতে পারে।
(ছ) অটোইমিউন রোগ: যেমন লুপাস, যা শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিডনির টিস্যুকে আক্রমণ করে।

৪। কিডনি ফেইলিউরের লক্ষণ:

৩. Nux Vomica: যাদের হজমের সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য, অলসতা এবং যারা অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড বা মশলাদার খাবার খেয়ে স্থূল হয়েছেন, তাদের জন্য এটি কার্যকর হতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি ফেইলিউরের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তবে রোগ বাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ পায়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

(ক) ক্লান্তি এবং দুর্বলতা: শরীরে বিষাক্ত পদার্থ জমা হওয়ার কারণে চরম ক্লান্তি এবং দুর্বলতা অনুভব হয়।
(খ) পায়ে, গোড়ালিতে এবং মুখে ফোলা (ইডিমা): কিডনি অতিরিক্ত লবণ ও জল অপসারণ করতে না পারার কারণে শরীরে জল জমে।
(গ) প্রস্রাবের পরিমাণে পরিবর্তন: হয় খুব কম প্রস্রাব হয়, অথবা রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব হয়।
(ঘ) শ্বাসকষ্ট: ফুসফুসে জল জমার কারণে শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে।
(ঙ) বমি বমি ভাব এবং বমি: শরীরে বিষাক্ত পদার্থ জমার কারণে হজমতন্ত্রে সমস্যা হয়।
(চ) ক্ষুধামন্দা এবং ওজন হ্রাস: খাওয়ার প্রতি অনীহা এবং পুষ্টিহীনতার কারণে ওজন কমে যেতে পারে।
(ছ) চুলকানি: ত্বকে বিষাক্ত পদার্থ জমার কারণে চুলকানি হতে পারে।
(জ) পেশী টান এবং ক্র্যাম্প: ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতার কারণে পেশীতে টান এবং ক্র্যাম্প হতে পারে।
(ঝ) ঘুমের সমস্যা: ইনসোম্নিয়া বা অস্থির পা সিন্ড্রোম দেখা দিতে পারে।
(ঞ) মনোযোগের অভাব এবং বিভ্রান্তি: মস্তিষ্কে বিষাক্ত পদার্থের প্রভাবের কারণে জ্ঞানীয় সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৫। জীবনধারণের জন্য ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন:

যখন কিডনি ফেইলিউর ESRD পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন জীবনধারণের জন্য দুটি প্রধান চিকিৎসা বিকল্প থাকে:

(১) ডায়ালাইসিস (Dialysis): ডায়ালাইসিস হলো একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যা কৃত্রিমভাবে কিডনির কাজ করে। এটি শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ, অতিরিক্ত লবণ এবং জল অপসারণ করে রক্তকে পরিষ্কার করে। দু'ধরনের প্রধান ডায়ালাইসিস আছে:
(ক) হেমোডায়ালাইসিস (Hemodialysis): এই পদ্ধতিতে একটি মেশিনের সাহায্যে রোগীর রক্ত শরীরের বাইরে বের করে এনে একটি বিশেষ ছাঁকনির (ডায়ালাইজার) মাধ্যমে পরিষ্কার করা হয় এবং তারপর পরিষ্কার রক্ত আবার শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এটি সাধারণত সপ্তাহে ৩ বার, প্রতি সেশনে ৩-৪ ঘণ্টা করে হাসপাতালে বা ডায়ালাইসিস সেন্টারে করতে হয়।
(খ) পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস (Peritoneal Dialysis - PD): এই পদ্ধতিতে রোগীর পেটের ভেতর অবস্থিত পেরিটোনিয়াম নামক ঝিল্লি ব্যবহার করে রক্ত পরিষ্কার করা হয়। একটি বিশেষ তরল পেটের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়, যা বর্জ্য পদার্থ শোষণ করে, তারপর সেই তরল বের করে ফেলা হয়। এটি বাড়িতেই করা যায়, যা রোগীর জন্য আরও নমনীয় হতে পারে। এটি ম্যানুয়াল (CAPD) অথবা মেশিন দ্বারা (APD) করা যেতে পারে।
(২) কিডনি প্রতিস্থাপন (Kidney Transplantation): এটি হলো কিডনি ফেইলিউরের সবচেয়ে কার্যকর এবং দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে একজন সুস্থ ব্যক্তির (দাতা) কিডনি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগীর শরীরে স্থাপন করা হয়। দাতা জীবিত বা মৃত উভয়ই হতে পারে।
(ক) সুবিধা: সফল প্রতিস্থাপনের পর রোগী প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন, ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয় না।
(খ) চ্যালেঞ্জ: প্রতিস্থাপনের জন্য উপযুক্ত দাতা খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে। এছাড়াও, প্রতিস্থাপনের পর রোগীকে সারা জীবন ইমিউনোসাপ্রেসিভ (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দমনকারী) ঔষধ খেতে হয় যাতে শরীর নতুন কিডনি প্রত্যাখ্যান না করে। এই ঔষধগুলির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে এবং রোগীকে সংক্রমণের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে।

উপসংহার:

কিডনি ফেইলিউর একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা যা জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। এর প্রাথমিক সনাক্তকরণ এবং সঠিক চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো ঝুঁকির কারণগুলি নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো কিডনি রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ESRD পর্যায়ে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা হিসেবে কাজ করে, যা রোগীদের জন্য দীর্ঘ এবং অপেক্ষাকৃত ভালো জীবনযাত্রার সুযোগ করে দেয়।