+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

লিভার ক্যান্সার (Liver Cancer):

লিভার ক্যান্সার হলো লিভারে অস্বাভাবিক এবং অনিয়ন্ত্রিত কোষের বৃদ্ধি ও বিস্তার। এটি একটি গুরুতর রোগ, যা লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে ব্যাহত করে। লিভারে অস্বাভাবিক, অস্বাস্থ্যকর কোষের বৃদ্ধি এটি প্রাথমিক লিভার ক্যান্সার হতে পারে (যা লিভারে শুরু হয়) অথবা মাধ্যমিক লিভার ক্যান্সার হতে পারে (যা শরীরের অন্য কোনো অংশ থেকে লিভারে ছড়িয়ে পড়ে)। সিরোসিস এবং দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি বা সি সংক্রমণ লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।


লিভার ক্যান্সারের প্রকারভেদ

লিভার ক্যান্সার মূলত দুই প্রকারের হতে পারে:-

(১) প্রাথমিক লিভার ক্যান্সার (Primary Liver Cancer):

(ক) এটি সেই ক্যান্সার যা সরাসরি লিভারের কোষ থেকে উৎপন্ন হয়। অর্থাৎ, ক্যান্সার প্রথম লিভারেই শুরু হয় এবং সেখানেই এর বৃদ্ধি ঘটে।
(খ) সবচেয়ে সাধারণ ধরণের প্রাথমিক লিভার ক্যান্সার হলো হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা (Hepatocellular Carcinoma - HCC)। এটি লিভারের প্রধান কোষ (হেপাটোসাইট) থেকে বিকশিত হয়।
(গ) অন্যান্য কম সাধারণ ধরণের প্রাথমিক লিভার ক্যান্সার হলো কোলাঞ্জিওকার্সিনোমা (Cholangiocarcinoma), যা পিত্তনালী থেকে উদ্ভূত হয়, এবং হেপাটোব্লাস্টোমা (Hepatoblastoma), যা সাধারণত শিশুদের মধ্যে দেখা যায়।

(২) মাধ্যমিক লিভার ক্যান্সার (Secondary Liver Cancer) / মেটাস্ট্যাটিক লিভার ক্যান্সার:

(ক) এটি সেই ক্যান্সার যা শরীরের অন্য কোনো অংশ থেকে শুরু হয়ে রক্তপ্রবাহ বা লসিকাতন্ত্রের মাধ্যমে লিভারে ছড়িয়ে পড়ে (মেটাস্ট্যাসাইজ করে)।
(খ) উদাহরণস্বরূপ, ফুসফুস, কোলন, স্তন, অগ্ন্যাশয়, পাকস্থলী বা অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার লিভারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
(গ) মাধ্যমিক লিভার ক্যান্সার প্রাথমিক লিভার ক্যান্সারের চেয়ে অনেক বেশি সাধারণ। যখন একজন ডাক্তার "লিভার ক্যান্সার" শব্দটি ব্যবহার করেন, তখন প্রায়শই এর অর্থ মেটাস্ট্যাটিক লিভার ক্যান্সার হতে পারে, যদি না বিশেষভাবে প্রাথমিক লিভার ক্যান্সারের কথা বলা হয়।

লিভার ক্যান্সারের প্রধান ঝুঁকির কারণসমূহ

লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে:

১. সিরোসিস (Cirrhosis):

(ক) সিরোসিস হলো লিভারের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির চূড়ান্ত পর্যায়, যেখানে লিভারের সুস্থ টিস্যুগুলো স্থায়ীভাবে দাগযুক্ত টিস্যু (ফাইব্রোসিস) দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।
(খ) যে কোনো কারণে সৃষ্ট সিরোসিস লিভার ক্যান্সারের (বিশেষ করে HCC) প্রধান ঝুঁকির কারণ। লিভারে স্থায়ী দাগ এবং কোষের পুনরুৎপাদনের চেষ্টা কোষের মিউটেশন এবং ক্যান্সারে রূপান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

২. দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B - HBV) বা হেপাটাইটিস সি (Hepatitis C - HCV) সংক্রমণ:

(ক) হেপাটাইটিস বি: এই ভাইরাস লিভারের কোষে প্রবেশ করে এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা সময়ের সাথে সাথে লিভারের ক্ষতি করে এবং সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের ক্ষেত্রে সিরোসিস না থাকলেও সরাসরি লিভার ক্যান্সার হতে পারে।
(খ) হেপাটাইটিস সি: দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস সি সংক্রমণও লিভারে ক্রমাগত প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা লিভারের সুস্থ টিস্যুকে ধীরে ধীরে দাগযুক্ত টিস্যুতে পরিণত করে। এটিও সিরোসিসের মাধ্যমে লিভার ক্যান্সারের একটি প্রধান কারণ।

৩. নন-অ্যালকোহলিক স্টেটোহেপাটাইটিস (NASH):

(ক) NASH হলো নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD) এর একটি গুরুতর রূপ, যেখানে লিভারে চর্বি জমার পাশাপাশি লিভারে প্রদাহ এবং কোষের ক্ষতিও হয়।
(খ) স্থূলতা, টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং মেটাবলিক সিন্ড্রোমযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে NASH ক্রমবর্ধমানভাবে লিভার ক্যান্সারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। NASH এর ফলে সৃষ্ট সিরোসিস লিভার ক্যান্সারের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

৪. অ্যালকোহল সেবন:

অতিরিক্ত এবং দীর্ঘমেয়াদী অ্যালকোহল সেবন অ্যালকোহলিক হেপাটাইটিস এবং সিরোসিসের কারণ হয়, যা পরবর্তীতে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

৫. আফলাটক্সিন এক্সপোজার:

আফলাটক্সিন হলো এক ধরণের বিষাক্ত পদার্থ যা ছাতা বা মোল্ড (যেমন Aspergillus flavus) দ্বারা উৎপন্ন হয়, যা ভুট্টা, চিনাবাদাম এবং অন্যান্য শস্যে জন্মাতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী আফলাটক্সিন এক্সপোজার লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের সাথে মিলিত হলে।

৬. জিনগত রোগ:

হিমোক্রোমাটোসিস (শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমা হওয়া), উইলসন'স ডিজিজ (শরীরে অতিরিক্ত কপার জমা হওয়া) এবং আলফা-১ অ্যান্টিট্রিপসিন ডেফিসিয়েন্সির মতো কিছু বিরল জেনেটিক রোগ লিভারের ক্ষতি করে এবং লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

লিভার ক্যান্সারের লক্ষণসমূহ

লিভার ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায়শই কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। যখন লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তখন ক্যান্সার অনেকটাই অগ্রসর হয়ে যেতে পারে। লক্ষণগুলো সাধারণত সিরোসিসের লক্ষণগুলোর সাথে মিলে যায় এবং এর মধ্যে রয়েছে:
(১) ওজন হ্রাস (অনিচ্ছাকৃত): কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া।
(২) ক্ষুধামন্দা: খাবার খাওয়ার ইচ্ছা কমে যাওয়া।
(৩) পেটে ব্যথা: বিশেষ করে পেটের উপরের ডানদিকে ব্যথা বা অস্বস্তি, যা কাঁধ পর্যন্ত ছড়াতে পারে।
(৪) পেট ফুলে যাওয়া: পেটে তরল জমা (অ্যাসাইটিস) বা লিভার বড় হওয়ার কারণে হতে পারে।
(৫) বমি বমি ভাব এবং বমি: ঘন ঘন বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
(৬) ক্লান্তি এবং দুর্বলতা: দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি এবং শক্তিহীনতা।
(৭) জন্ডিস: ত্বক এবং চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া।
(৮) গাঢ় প্রস্রাব এবং ফ্যাকাশে মল: বিলিরুবিন বিপাকের সমস্যার কারণে।
(৯) ত্বকে চুলকানি: পিত্ত লবণ জমার কারণে।
(১০) জ্বর: হালকা থেকে মাঝারি জ্বর।
(১১) পেটের ডান পাশে একটি শক্ত পিণ্ড অনুভব করা: লিভার বড় হওয়ার কারণে।

রোগ নির্ণয়

লিভার ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়:
(১) রক্ত পরীক্ষা: লিভার ফাংশন টেস্ট, আলফা-ফেটোপ্রোটিন (AFP) পরীক্ষা (যা লিভার ক্যান্সারের একটি টিউমার মার্কার)।
(২) ইমেজিং পরীক্ষা: আল্ট্রাসাউন্ড, সিটি স্ক্যান, এমআরআই লিভারে টিউমারের অবস্থান, আকার এবং বিস্তার নির্ধারণে সহায়ক।
(৩) বায়োপসি: লিভারের একটি ছোট টিস্যু নিয়ে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করা হয়, যা ক্যান্সারের ধরন এবং নিশ্চিত নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন।
(৪) ল্যাপারোস্কোপি: পেটে ছোট ছিদ্র করে একটি ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে লিভার পরীক্ষা করা হয়।

চিকিৎসা

লিভার ক্যান্সারের চিকিৎসা ক্যান্সারের ধরন, পর্যায় (কতটা ছড়িয়ে পড়েছে), রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং লিভারের কার্যকারিতার উপর নির্ভর করে। কিছু সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতি হলো:
(১) সার্জারি (অপারেশন): যদি ক্যান্সার লিভারের একটি ছোট অংশে সীমাবদ্ধ থাকে এবং লিভারের কার্যকারিতা ভালো থাকে, তাহলে টিউমারটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা যেতে পারে।
(২) লিভার প্রতিস্থাপন (Liver Transplant): কিছু নির্বাচিত ক্ষেত্রে, যেখানে ক্যান্সার লিভারের একটি নির্দিষ্ট ছোট অংশে সীমাবদ্ধ এবং রোগীর সিরোসিস রয়েছে, সেখানে লিভার প্রতিস্থাপন একটি বিকল্প হতে পারে।
(৩) অ্যাবলেশন থেরাপি (Ablation Therapy): এই পদ্ধতিতে টিউমার কোষে উচ্চ তাপমাত্রা (রেডিওফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন) বা নিম্ন তাপমাত্রা (ক্রায়োঅ্যাবলেশন) প্রয়োগ করে ধ্বংস করা হয়।
(৪) কেমোএম্বোলাইজেশন (Chemoembolization - TACE): এই পদ্ধতিতে সরাসরি টিউমারের রক্তনালীতে কেমোথেরাপির ঔষধ এবং ছোট ছোট কণা ইনজেকশন দেওয়া হয়, যা টিউমারে রক্ত প্রবাহ বন্ধ করে দেয় এবং ঔষধকে টিউমারের মধ্যে আটকে রাখে।
(৫) রেডিওএম্বোলাইজেশন (Radioembolization - SIRT): TACE এর মতোই, কিন্তু এখানে তেজস্ক্রিয় কণা ব্যবহার করা হয়।
(৬) রেডিয়েশন থেরাপি (Radiation Therapy): উচ্চ-শক্তির রশ্মি ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়।
(৭) টার্গেটেড থেরাপি (Targeted Therapy): নির্দিষ্ট ঔষধ ব্যবহার করা হয় যা ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি এবং বিভাজনকে বাধা দেয়, যেমন সোর্যাফেনিব (Sorafenib)।
(৮) ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy): এই চিকিৎসায় রোগীর নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উদ্দীপিত করা হয়। লিভার ক্যান্সার একটি জটিল রোগ, এবং এর চিকিৎসা প্রায়শই একাধিক বিশেষজ্ঞের (যেমন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট, হেপাটোলজিস্ট, অঙ্কোলজিস্ট, সার্জন) সমন্বয়ে গঠিত একটি দল দ্বারা পরিচালিত হয়। সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা জীবন বাঁচানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।