হেপাটাইটিস বলতে লিভারের প্রদাহকে বোঝায়। এটি সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের কারণে হয়, তবে অন্যান্য কারণেও হতে পারে, যেমন: অ্যালকোহলের অতিরিক্ত ব্যবহার, কিছু ঔষধ, রাসায়নিক, জেনেটিক সমস্যা বা অটোইমিউন রোগ।
হেপাটাইটিস মূলত পাঁচ প্রকারের ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট হয়: হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই। প্রতিটি ভাইরাসের সংক্রমণের ধরণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসার পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।
(ক) সংক্রমণের কারণ: এটি মূলত দূষিত খাবার বা পানির
মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রামিত ব্যক্তির মল দ্বারা দূষিত পানি বা খাবার গ্রহণ করলে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।
(খ) লক্ষণ: ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, পেটে ব্যথা, ক্ষুধা হ্রাস, গাঢ় প্রস্রাব এবং জন্ডিস (ত্বক ও চোখ হলুদ হওয়া)।
(গ) প্রকৃতি: সাধারণত তীব্র হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগের দিকে পরিচালিত করে না।
বেশিরভাগ মানুষই চিকিৎসা ছাড়াই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
(ঘ) প্রতিরোধ: ভালোভাবে হাত ধোয়া এবং হেপাটাইটিস এ টিকা নেওয়া এর প্রধান প্রতিরোধমূলক উপায়।
(ক) সংক্রমণের কারণ: এটি সংক্রামিত রক্ত, বীর্য বা অন্যান্য শারীরিক
তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। যৌন মিলন, আক্রান্ত মায়ের থেকে শিশুর জন্মকালে, এবং দূষিত সূঁচ ব্যবহারের মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে।
(খ) লক্ষণ: জন্ডিস, অবসাদ, পেটে ব্যথা, জয়েন্টে ব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য, বমি বমি ভাব, গাঢ় প্রস্রাব। কিছু
ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে।
(গ) প্রকৃতি: এটি তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের
কারণ হতে পারে। শিশুদের মধ্যে এই সংক্রমণের দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
(ঘ) প্রতিরোধ: হেপাটাইটিস বি টিকা এর প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। নিরাপদ যৌন সম্পর্ক এবং দূষিত
সূঁচ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা জরুরি।
(ক) সংক্রমণের কারণ: সাধারণত সংক্রামিত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়, যেমন: দূষিত সূঁচ
ব্যবহার, রক্ত সঞ্চালন (বিশেষ করে পুরোনো দিনে, যখন রক্তের স্ক্রিনিং ছিল না) বা খুব কম ক্ষেত্রে যৌন মিলনের মাধ্যমে।
(খ) লক্ষণ: অনেক ক্ষেত্রে কোনো প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায় না। পরে ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, পেটে ব্যথা, গাঢ় প্রস্রাব,
জয়েন্টে ব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য, জন্ডিস এবং ত্বকে চুলকানি হতে পারে।
(গ) প্রকৃতি: এটি দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
(ঘ) প্রতিরোধ: হেপাটাইটিস সি এর কোনো টিকা নেই। রক্ত সঞ্চালনের আগে রক্ত পরীক্ষা করা, দূষিত সূঁচ ব্যবহার না
করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
(ক) সংক্রমণের কারণ: হেপাটাইটিস ডি ভাইরাস শুধুমাত্র হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত
ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এটি হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের সাথে অথবা পরে হতে পারে। এটি রক্ত এবং অন্যান্য শারীরিক তরলের মাধ্যমে ছড়ায়।
(খ) প্রকৃতি: হেপাটাইটিস বি এর সাথে মিলিত হয়ে এটি লিভারের ক্ষতিকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগ ও
জটিলতা সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়ায়।
(গ) প্রতিরোধ: হেপাটাইটিস বি টিকা নিয়ে হেপাটাইটিস ডি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
(ক) সংক্রমণের কারণ: হেপাটাইটিস এ এর মতো এটিও মূলত দূষিত খাবার বা পানির
মাধ্যমে ছড়ায়। যেসব এলাকায় স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভালো নয়, সেখানে এর সংক্রমণ বেশি দেখা যায়।
(খ) প্রকৃতি: সাধারণত তীব্র সংক্রমণ ঘটায় এবং বেশিরভাগ মানুষ চিকিৎসা ছাড়াই সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে গর্ভবতী মহিলাদের
ক্ষেত্রে এটি গুরুতর হতে পারে।
(গ) প্রতিরোধ: বিশুদ্ধ পানি পান করা এবং খাবার ভালোভাবে রান্না করে খাওয়া এর প্রধান প্রতিরোধমূলক উপায়। কিছু দেশে
হেপাটাইটিস ই এর টিকা পাওয়া যায়।
যদিও হেপাটাইটিসের ধরণ অনুযায়ী লক্ষণগুলি ভিন্ন হতে পারে, কিছু সাধারণ লক্ষণ নিচে দেওয়া হলো:
(ক) ক্লান্তি এবং দুর্বলতা: শরীর খুব ক্লান্ত এবং দুর্বল লাগা।
(খ) পেটে ব্যথা: বিশেষ করে পেটের উপরের ডান দিকে অস্বস্তি বা ব্যথা।
(গ) ক্ষুধামান্দ্য: খাবারের ইচ্ছা কমে যাওয়া।
(ঘ) বমি বমি ভাব এবং বমি: ঘন ঘন বমি বমি ভাব হওয়া বা বমি হওয়া।
(ঙ) জন্ডিস: ত্বক এবং চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া।
(চ) গাঢ় প্রস্রাব: প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হওয়া।
(ছ) ফ্যাকাশে মল: মলের রঙ হালকা বা ফ্যাকাশে হওয়া।
(জ) জ্বর: হালকা থেকে মাঝারি জ্বর।
(ঝ) জয়েন্ট এবং পেশী ব্যথা: শরীর এবং গাঁটে ব্যথা।
(ক) টিকা: হেপাটাইটিস এ এবং হেপাটাইটিস বি এর জন্য কার্যকর টিকা পাওয়া যায়, যা এই
রোগগুলি প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হেপাটাইটিস ডি প্রতিরোধে হেপাটাইটিস বি এর টিকা কার্যকর।
(খ) স্বাস্থ্যবিধি: ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, যেমন – খাবার আগে ও পরে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর ভালোভাবে হাত ধোয়া
হেপাটাইটিস এ এবং ই সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক।
(গ) নিরাপদ পানীয় জল ও খাদ্য: দূষিত জল ও খাবার পরিহার করা হেপাটাইটিস এ এবং ই থেকে রক্ষা করে।
(ঘ) রক্ত ও শারীরিক তরলের সংস্পর্শ পরিহার: সংক্রামিত ব্যক্তির রক্ত, বীর্য বা অন্যান্য শারীরিক তরলের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা
হেপাটাইটিস বি এবং সি প্রতিরোধে অপরিহার্য। এর মধ্যে রয়েছে সুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক, শেয়ার্ড সূঁচ ব্যবহার না করা এবং জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করা।
(ঙ) চিকিৎসা: হেপাটাইটিসের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা ভিন্ন হয়। তীব্র হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে সাধারণত বিশ্রাম এবং লক্ষণভিত্তিক
চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি এবং সি এর জন্য অ্যান্টিভাইরাল ঔষধ উপলব্ধ, যা ভাইরাসের প্রতিলিপি নিয়ন্ত্রণ করে লিভারের ক্ষতি কমাতে
সাহায্য করে। কিছু ক্ষেত্রে লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। হেপাটাইটিস একটি গুরুতর রোগ, যা সময়মতো নির্ণয় ও চিকিৎসা না করা হলে লিভারের
মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।