গুরুতর হাইপোটেনশন বা শক হলো একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং জীবন- হুমকিপূর্ণ অবস্থা যেখানে রক্তচাপ এতটাই মারাত্মকভাবে কমে যায় যে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিতে (যেমন মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, কিডনি) পর্যাপ্ত রক্ত এবং অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। এটি একটি মেডিকেল জরুরি অবস্থা যার জন্য অবিলম্বে চিকিৎসার প্রয়োজন। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এটি অঙ্গের ক্ষতি, অঙ্গ ব্যর্থতা, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
"শক" শব্দটি শুধু "ভয়" বা "আশ্চর্য" বোঝায় না, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি গুরুতর ক্লিনিক্যাল অবস্থা। যখন শরীর তার টিস্যু এবং অঙ্গগুলিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন এবং পুষ্টি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, তখনই শকের সৃষ্টি হয়। রক্তচাপের মারাত্মক পতন এই অপর্যাপ্ত সরবরাহের একটি প্রধান কারণ। সহজ কথায়, শকে শরীর তার মৌলিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে পারে না।
শক বিভিন্ন কারণে হতে পারে, যা সাধারণত এর প্রকারভেদ অনুসারে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়:
১. হাইপোভোলেমিক শক (Hypovolemic Shock):
(ক) রক্তক্ষরণ: গুরুতর আঘাত, অভ্যন্তরীণ রক্তপাত (যেমন গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল
রক্তপাত), বা অস্ত্রোপচারের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ।
(খ) গুরুতর পানিশূন্যতা: ডায়রিয়া, বমি, অতিরিক্ত ঘাম, বা গুরুতর পোড়া
রোগের কারণে শরীরের তরল মারাত্মকভাবে কমে যাওয়া।
(গ) গুরুতর ডিহাইড্রেশন: পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল পান না করার কারণে।
২. কার্ডিওজেনিক শক (Cardiogenic Shock):
যখন হৃৎপিণ্ড পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে অক্ষম হয়।
(ক) হার্ট অ্যাটাক (মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন): হৃৎপিণ্ডের পেশী গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে।
(খ) হৃৎপিণ্ডের পেশীর দুর্বলতা (কার্ডিওমায়োপ্যাথি): হৃৎপিণ্ডের পাম্প করার ক্ষমতা কমে যাওয়া।
(গ) গুরুতর হার্ট ফেইলিউর: হৃৎপিণ্ড শরীরের চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে ব্যর্থ হলে।
(ঘ) অ্যারিথমিয়া: হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন অনিয়মিত এবং অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত বা ধীর হলে।
৩. ডিস্ট্রিবিউটিভ শক (Distributive Shock):
যখন রক্তনালীগুলো অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত হয়, যার ফলে রক্ত সঠিকভাবে বিতরণ হয় না।
(ক) সেপটিক শক (Septic Shock): গুরুতর সংক্রমণের কারণে শরীর জুড়ে ব্যাপক প্রদাহ এবং
রক্তনালীগুলির প্রসারণ। এটি শকের সবচেয়ে সাধারণ প্রকারগুলোর মধ্যে একটি।
(খ) অ্যানাফাইল্যাকটিক শক (Anaphylactic Shock): গুরুতর অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া যা
রক্তনালীগুলির আকস্মিক প্রসারণ এবং শ্বাসনালীর সংকীর্ণতা ঘটায়।
(গ) নিউরোজেনিক শক (Neurogenic Shock): মেরুদণ্ডের আঘাত বা স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতির
কারণে রক্তনালীগুলির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারানো।
৪. অবস্ট্রাকটিভ শক (Obstructive Shock):
যখন হৃৎপিণ্ডে বা হৃৎপিণ্ড থেকে রক্ত প্রবাহে একটি শারীরিক বাধা থাকে।
(ক) পালমোনারি এমবোলিজম: ফুসফুসের ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধা, যা হৃৎপিণ্ড থেকে ফুসফুসে রক্ত প্রবাহকে বাধা দেয়।
(খ) কার্ডিয়াক ট্যাম্পোনাড (Cardiac Tamponade): হৃৎপিণ্ডের চারপাশে তরল জমা হওয়া, যা হৃৎপিণ্ডকে সঠিকভাবে প্রসারিত
হতে এবং রক্ত পাম্প করতে বাধা দেয়।
(গ) টেনশন নিউমোথোরাক্স: ফুসফুসের চারপাশে বাতাস জমা হওয়া, যা হৃৎপিণ্ড এবং বড় রক্তনালীগুলিকে সংকুচিত করে।
শকের লক্ষণগুলো দ্রুত দেখা দেয় এবং পরিস্থিতি অনুসারে ভিন্ন হতে পারে।
প্রাথমিক লক্ষণগুলো গুরুতর হাইপোটেনশন নির্দেশ করে:
(ক) নিম্ন রক্তচাপ: সাধারণত সিস্টোলিক রক্তচাপ ৯০ mmHg-এর নিচে।
(খ) দ্রুত ও দুর্বল নাড়ি (পালস): হৃৎপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত হয় কিন্তু রক্তচাপ কম থাকায় নাড়ি দুর্বল অনুভূত হয়।
(গ) দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস: শরীর অক্সিজেনের অভাব পূরণের চেষ্টা করে।
(ঘ) ঠান্ডা, ঘর্মাক্ত, ও ফ্যাকাশে ত্বক: ত্বকে রক্ত সরবরাহ কমে যাওয়ায়।
(ঙ) বিভ্রান্তি বা মানসিক অবস্থার পরিবর্তন: মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাবের কারণে।
(চ) প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া: কিডনিতে রক্ত সরবরাহ কমে যাওয়ায়।
(ছ) মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া: চরম ক্ষেত্রে।
(জ) শ্বাসকষ্ট: বিশেষ করে গুরুতর শকে।
(ঝ) রঠোঁট ও নখ নীলচে হয়ে যাওয়া: অক্সিজেনের অভাবের কারণে।
গুরুতর হাইপোটেনশন বা শক একটি জীবন-হুমকির কারণ, তাই এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি।
এর জন্য অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি এবং নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন। চিকিৎসা শকের কারণের উপর নির্ভর করে এবং এর প্রধান লক্ষ্য হলো:
(ক) রক্তচাপ বৃদ্ধি: ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড (IV fluids) বা রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে রক্তের পরিমাণ বাড়ানো।
(খ) অক্সিজেন সরবরাহ: অক্সিজেন মাস্ক বা ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করা।
(গ) মূল কারণের চিকিৎসা:
(১) সংক্রমণ: অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে সেপটিক শকের চিকিৎসা করা।
(২) রক্তক্ষরণ: রক্তপাত বন্ধ করা এবং প্রয়োজন অনুসারে রক্ত সঞ্চালন করা।
(৩) হৃদপিণ্ডের সমস্যা: হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ফেইলিউরের চিকিৎসা করা, যেমন ওষুধ বা পদ্ধতিগত হস্তক্ষেপ।
(৪) অ্যালার্জি: অ্যান্টিহিস্টামিন বা এপিনেফ্রিন (অ্যাড্রেনালিন) দিয়ে অ্যানাফাইল্যাকটিক শকের চিকিৎসা।
(৫) শারীরিক বাধা দূর করা: পালমোনারি এমবোলিজম বা ট্যাম্পোনাডের মতো বাধা অপসারণ করা।
(৬) অঙ্গ সমর্থন: কিডনি ব্যর্থতা বা শ্বাসযন্ত্রের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে ডায়ালাইসিস বা ভেন্টিলেশনের মতো
সহায়ক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মনে রাখবেন, গুরুতর হাইপোটেনশন বা শকের যেকোনো লক্ষণ দেখা গেলে অবিলম্বে (দেশের জরুরি নম্বর)
নম্বরে কল করুন অথবা রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান। দ্রুত পদক্ষেপ জীবন বাঁচাতে পারে।