+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন (Orthostatic Hypotension) বা পোস্টুরাল হাইপোটেনশন (Postural Hypotension):

অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন (Orthostatic Hypotension) বা পোস্টুরাল হাইপোটেনশন (Postural Hypotension) হলো এক ধরনের নিম্ন রক্তচাপ যা বসা বা শুয়ে থাকা অবস্থা থেকে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ালে ঘটে। এটি একটি সাধারণ অবস্থা এবং এর পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ ও প্রক্রিয়া কাজ করে।


অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন কী?

যখন একজন ব্যক্তি শুয়ে থাকা বা বসে থাকা থেকে দ্রুত উঠে দাঁড়ান, তখন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে রক্ত সাময়িকভাবে পায়ের দিকে চলে যায়। এর ফলে মস্তিষ্কে এবং শরীরের উপরের অংশে রক্তের সরবরাহ সাময়িকভাবে কমে যায়। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে, শরীর দ্রুত এই পরিবর্তনকে সামলে নেয়। স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র (Autonomic Nervous System) হৃৎপিণ্ডের গতি বাড়িয়ে এবং রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে। কিন্তু যাদের অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া দুর্বল থাকে বা সঠিকভাবে কাজ করে না। ফলে রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়।

কারণসমূহ

অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশনের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যার মধ্যে কিছু সাধারণ কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
(১) পানিশূন্যতা: পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান না করলে শরীরের রক্তের পরিমাণ কমে যেতে পারে, যা অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশনের ঝুঁকি বাড়ায়।
(২) ওষুধ: উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, বিষণ্নতা বা পার্কিনসন রোগের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত কিছু ওষুধ রক্তচাপ কমাতে পারে এবং এই অবস্থার কারণ হতে পারে।
(৩) হৃদরোগ: হৃদপিণ্ডের কার্যকারিতা কমে গেলে বা হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন অনিয়মিত হলে তা মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে পারে না।
(৪) স্নায়বিক সমস্যা: পার্কিনসন রোগ, ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি বা অন্যান্য স্নায়বিক সমস্যা স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
(৫) অন্তঃস্রাবী গ্রন্থির সমস্যা: অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির সমস্যা (যেমন অ্যাডিসন রোগ) বা থাইরয়েডের সমস্যাও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে।
(৬) দীর্ঘদিন বিছানায় থাকা: দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় শুয়ে থাকলে শরীরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
(৭) রক্তক্ষরণ: যেকোনো কারণে শরীরে রক্তক্ষরণ হলে রক্তের পরিমাণ কমে যায়, যা অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন সৃষ্টি করতে পারে।
(৮) বয়স: বয়স বাড়ার সাথে সাথে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কিছুটা কমে আসে, তাই বয়স্কদের মধ্যে এই অবস্থা বেশি দেখা যায়।

লক্ষণসমূহ

অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশনের প্রধান লক্ষণগুলো সাধারণত হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ানোর কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটের মধ্যেই দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে:
(১) মাথা ঘোরা বা হালকা মাথা ব্যথা: এটি সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ।
(২) দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া: চোখে অন্ধকার দেখা বা ঝাপসা দেখা যেতে পারে।
(৩) ভারসাম্যহীনতা: পড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হতে পারে।
(৪) দুর্বলতা বা ক্লান্তি: শরীরে শক্তি কমে যাওয়া।
(৫) বমি বমি ভাব: অসুস্থ লাগতে পারে।
(৬) অজ্ঞান হয়ে যাওয়া (সিনকোপ): গুরুতর ক্ষেত্রে ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

চিকিৎসক সাধারণত রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস শুনে এবং শারীরিক পরীক্ষা করে অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন নির্ণয় করেন। বসা, শোয়া এবং দাঁড়ানো অবস্থায় রক্তচাপ পরিমাপ করা হয়। রক্তচাপের উল্লেখযোগ্য পতন এই অবস্থার নির্দেশক। চিকিৎসা সাধারণত কারণের উপর নির্ভর করে:-
(ক) কারণ নির্ণয় ও তার চিকিৎসা: যদি কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা অন্তর্নিহিত রোগের কারণে এটি ঘটে থাকে, তবে সেই কারণের চিকিৎসা করা হয়।
(খ) জীবনযাত্রার পরিবর্তন:
(১) ধীরে ধীরে ওঠা: বসা বা শুয়ে থাকা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানো।
(২) পর্যাপ্ত পানি পান: শরীরকে সতেজ রাখতে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা।
(৩) লবণ গ্রহণ: কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক লবণ গ্রহণের পরিমাণ বাড়ানোর পরামর্শ দিতে পারেন (তবে এটি অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হতে হবে)।
(৪) ছোট ও ঘন ঘন খাবার: একসঙ্গে বেশি খাবার না খেয়ে ছোট ছোট পরিমাণে ঘন ঘন খাবার গ্রহণ করা।
(৫) কম্প্রেশন স্টকিংস: পায়ে রক্ত জমাট বাঁধা রোধ করতে এবং রক্ত সঞ্চালন উন্নত করতে কম্প্রেশন স্টকিংস ব্যবহার করা যেতে পারে।
(৬) অ্যালকোহল পরিহার: অ্যালকোহল রক্তনালীকে প্রসারিত করে রক্তচাপ কমাতে পারে, তাই এটি পরিহার করা উচিত।
(গ) ওষুধ: কিছু ক্ষেত্রে, রক্তচাপ বাড়াতে এবং উপসর্গ কমাতে চিকিৎসক ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারেন। অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন একটি দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন অবস্থা, তবে সঠিক রোগ নির্ণয় এবং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যদি এমন লক্ষণ দেখা যায়, তবে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা উচিত।