BMI ছাড়াও শরীরের চর্বি বণ্টন এবং মেটাবলিক স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে স্থূলতাকে আরও কিছু ভাগে ভাগ করা যায় সে অনুযায়ী, BMI ছাড়াও শরীরের চর্বি বণ্টন এবং মেটাবলিক স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে স্থূলতার অন্যান্য ধরনগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
BMI একটি ভালো প্রাথমিক নির্দেশক হলেও, এটি শরীরের চর্বি বণ্টন, পেশী ভর বা মেটাবলিক স্বাস্থ্যের সঠিক চিত্র দিতে পারে না। তাই, স্থূলতার আরও নির্দিষ্ট ধরন বুঝতে শরীরের চর্বি বণ্টন এবং মেটাবলিক দিকগুলো বিবেচনা করা হয়।
ভিসারাল স্থূলতা হলো পেটের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চারপাশে চর্বি জমা হওয়া। এই ধরনের চর্বি ত্বকের নিচের চর্বির (subcutaneous fat) চেয়ে বেশি বিপজ্জনক। ভিসারাল ফ্যাট বিপাকীয়ভাবে সক্রিয় থাকে এবং বিভিন্ন প্রদাহজনক রাসায়নিক ও হরমোন নিঃসরণ করে, যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। কোমর পরিমাপ (Waist Circumference) সাধারণত ভিসারাল স্থূলতা পরিমাপের একটি ভালো উপায়।
ত্বকের নিচের স্থূলতা হলো ত্বকের ঠিক নিচে জমা হওয়া চর্বি। এই চর্বি সাধারণত উরু, নিতম্ব এবং বাহুতে বেশি দেখা যায়। যদিও এটি শরীরের সবচেয়ে সাধারণ চর্বি, ভিসারাল চর্বির তুলনায় এটি কম ক্ষতিকারক। তবে, অতিরিক্ত ত্বকের নিচের চর্বিও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যদি এর পরিমাণ খুব বেশি হয়।
অ্যান্ড্রয়েড স্থূলতাকে 'আপেল আকৃতির' স্থূলতাও বলা হয়, কারণ এই ক্ষেত্রে চর্বি মূলত পেট এবং বুকের অঞ্চলে বেশি জমে। পুরুষদের মধ্যে এই ধরনটি বেশি দেখা যায়, তবে মেনোপজের পর মহিলাদের মধ্যেও এটি হতে পারে। অ্যান্ড্রয়েড স্থূলতা ভিসারাল চর্বির উপস্থিতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এবং এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং মেটাবলিক সিনড্রোমের মতো রোগের উচ্চ ঝুঁকির কারণ।
গাইনোয়েড স্থূলতাকে 'নাশপাতি আকৃতির' স্থূলতাও বলা হয়, কারণ এই ক্ষেত্রে চর্বি মূলত নিতম্ব এবং উরুতে বেশি জমে। মহিলাদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। এই ধরনের চর্বি সাধারণত ত্বকের নিচের চর্বি (subcutaneous fat) হয় এবং এটি অ্যান্ড্রয়েড স্থূলতার চেয়ে কম স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়। তবে, অতিরিক্ত ওজন সব সময়ই স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
৪. স্থূলতা শ্রেণী ১ (Class I Obesity): BMI ৩০.০ - ৩৪.৯
এই ধরণের স্থূলতা শরীরের ভেতরের কিছু কারণ বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, কুশিং সিনড্রোম (Cushing's Syndrome) যেখানে শরীরে অতিরিক্ত কর্টিসল হরমোন তৈরি হয়, তা কেন্দ্রীয় স্থূলতা এবং অন্যান্য উপসর্গ সৃষ্টি করে। পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) বা থাইরয়েডের সমস্যাও এই ধরনের স্থূলতার কারণ হতে পারে। এই ক্ষেত্রে মূল কারণের চিকিৎসা করা জরুরি।
বহিরাগত স্থূলতা হলো বাহ্যিক কারণ, যেমন অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যকলাপের অভাবের ফলে সৃষ্ট স্থূলতা। এটি আধুনিক জীবনযাত্রার একটি সাধারণ সমস্যা, যেখানে ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং বসে থাকার প্রবণতা বেড়ে গেছে। এই ধরনের স্থূলতা প্রতিরোধ এবং চিকিৎসায় জীবনযাত্রার পরিবর্তন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শৈশব স্থূলতা হলো শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা। এটি বিশ্বজুড়ে একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সমস্যা। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় পান করা, কম শারীরিক কার্যকলাপ এবং স্ক্রিন টাইম বৃদ্ধি এর প্রধান কারণ। শৈশব স্থূলতা প্রাপ্তবয়স্কদের স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায় এবং অল্প বয়সেই টাইপ ২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগের মতো স্বাস্থ্য সমস্যা ডেকে আনতে পারে।
এই শ্রেণীর মানুষদের BMI স্থূলতার পর্যায়ে থাকলেও তাদের মেটাবলিক স্বাস্থ্য তুলনামূলকভাবে ভালো থাকে। অর্থাৎ, তাদের রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং ইনসুলিনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকে। যদিও তারা স্থূল, তাদের মধ্যে মেটাবলিক সিনড্রোমের ঝুঁকি কম থাকে। তবে, দীর্ঘমেয়াদে MHO থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়তে পারে, তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
এই শ্রেণীর ব্যক্তিরা স্থূলতার পাশাপাশি বিভিন্ন মেটাবলিক অস্বাভাবিকতায় ভোগেন, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং উচ্চ রক্তে শর্করা। MUHO আক্রান্ত ব্যক্তিদের টাইপ ২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। এটি স্থূলতার সবচেয়ে সাধারণ এবং উদ্বেগজনক ধরন।স্থূলতার এই বিভিন্ন ধরনগুলো বুঝলে চিকিৎসকরা রোগীর জন্য আরও কার্যকর এবং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন। যদি স্থূলতা নিয়ে কোনো উদ্বেগ থাকে, তবে একজন চিকিৎসক বা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।