+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

প্যানক্রিয়াটাইটিস রোগের ধরন কি কি

প্যানক্রিয়াটাইটিস হলো অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ। অগ্ন্যাশয় আমাদের পেটের পেছনে অবস্থিত একটি গ্রন্থি, যা খাবার হজমে সাহায্যকারী এনজাইম এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন (যেমন ইনসুলিন) তৈরি করে। যখন এই অগ্ন্যাশয় কোনো কারণে ফুলে যায় বা প্রদাহ হয়, তখন তাকে প্যানক্রিয়াটাইটিস বলে।
প্যানক্রিয়াটাইটিস মূলত দুই ধরনের হয়:


১. অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস (Acute Pancreatitis)

অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস হলো অগ্ন্যাশয়ের একটি হঠাৎ শুরু হওয়া প্রদাহ। এটি সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে এবং জীবন-হুমকিও হতে পারে। অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসে আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষই যথাযথ চিকিৎসা পেলে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।

লক্ষণ:

(ক) পেটের উপরের অংশে হঠাৎ তীব্র ব্যথা, যা পিঠের দিকে বা বাম কাঁধের নিচে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
(খ) বমি বমি ভাব এবং বমি।
(গ) দ্রুত হৃদস্পন্দন।
(ঘ) জ্বর।
(ঙ) পেটে স্পর্শ করলে ব্যথা বা সংবেদনশীলতা।
(চ) কিছু ক্ষেত্রে জন্ডিস (ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া)।

কারণ:

(১) পিত্তথলিতে পাথর: এটি অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। পিত্তনালীর পাথর অগ্ন্যাশয়ের নালী বন্ধ করে দিলে এনজাইমগুলো অগ্ন্যাশয়ের ভেতরেই আটকে গিয়ে প্রদাহ সৃষ্টি করে।
(২) অতিরিক্ত মদ্যপান: অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
(৩) কিছু ওষুধ।
(৪) রক্তে উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড (এক ধরনের চর্বি) বা ক্যালসিয়ামের মাত্রা।
(৫) অগ্ন্যাশয়ে আঘাত।
(৬) কিছু সংক্রমণ, যেমন মাম্পস।
(৭) স্থূলতা।
চিকিৎসা: অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের চিকিৎসার জন্য সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে:
(১) শিরাপথে তরল সরবরাহ (IV ফ্লুইড)।
(২) ব্যথা কমানোর ঔষধ।
(৩) যদি সংক্রমণ থাকে, তাহলে অ্যান্টিবায়োটিক।
(৪) যদি পিত্তপাথর কারণ হয়, তাহলে সেটির অপসারণের জন্য সার্জারি বা অন্য কোনো প্রক্রিয়া।
(৫) অগ্ন্যাশয়কে বিশ্রাম দিতে কিছু সময়ের জন্য খাবার বন্ধ রাখা বা টিউবের মাধ্যমে পুষ্টি সরবরাহ করা।

২. ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস (Chronic Pancreatitis)

ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস হলো অগ্ন্যাশয়ের একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ। এটি ধীরে ধীরে বিকশিত হয় এবং অগ্ন্যাশয়ের স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে। দীর্ঘদিনের প্রদাহের ফলে অগ্ন্যাশয় ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, যা হজম এবং ইনসুলিন উৎপাদনে সমস্যা সৃষ্টি করে।

লক্ষণ:

(ক) পেটের উপরের অংশে বারবার বা constante ব্যথা, যা পিঠের দিকেও যেতে পারে। এই ব্যথা হালকা থেকে তীব্র হতে পারে।
(খ) বদহজম, বমি বমি ভাব, বমি।
(গ) অপুষ্টি ও ওজন কমে যাওয়া, কারণ অগ্ন্যাশয় খাবার হজমের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম তৈরি করতে পারে না।
(ঘ) চর্বিযুক্ত, দুর্গন্ধযুক্ত এবং সহজে ফ্ল্যাশ না হওয়া মল (steatorrhea)।
(ঙ) ডায়াবেটিসের লক্ষণ, যেমন অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব এবং ক্লান্তি, কারণ অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদন ব্যাহত হয়।
(চ) জন্ডিস।

কারণ:

(১) দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মদ্যপান: এটি ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ কারণ।
(২) কিছু জিনগত কারণ (যেমন সিস্টিক ফাইব্রোসিস)।
(৩) অটোইমিউন রোগ (যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অগ্ন্যাশয়কে আক্রমণ করে)।
(৪) অগ্ন্যাশয়ের নালীতে বাধা।
(৫) তীব্র প্যানক্রিয়াটাইটিসের বারবার আক্রমণ।
(৬) ধূমপান।
(৭) কিছু ক্ষেত্রে কারণ অজানা থাকে।
চিকিৎসা: ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো ব্যথা কমানো এবং হজম কার্যকারিতা উন্নত করা। অগ্ন্যাশয়ের ক্ষতি সাধারণত ফিরিয়ে আনা যায় না, তবে উপযুক্ত যত্নের মাধ্যমে লক্ষণগুলি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। চিকিৎসার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে:
(১) জীবনযাত্রার পরিবর্তন: অ্যালকোহল ও ধূমপান ত্যাগ করা, কম চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া এবং ছোট ছোট বারে খাবার গ্রহণ করা।
(২) ব্যথা কমানোর ঔষধ।
(৩) হজম এনজাইম সাপ্লিমেন্ট: খাবার হজমে সাহায্য করার জন্য এনজাইম ক্যাপসুল গ্রহণ করা।
(৪) ডায়াবেটিস হলে ইনসুলিন।
(৫) অটোইমিউন প্যানক্রিয়াটাইটিস হলে স্টেরয়েড ঔষধ।
(৬) কিছু ক্ষেত্রে সার্জারি, যদি নালীতে বাধা বা সিস্টের মতো জটিলতা থাকে। যদি প্যানক্রিয়াটাইটিসের কোনো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে পারে এবং জটিলতা প্রতিরোধ করতে পারে।