অর্শ বা পাইলস (Hemorrhoids) অর্শ বা পাইলস (Hemorrhoids) মানবজাতির অন্যতম প্রাচীন রোগগুলোর মধ্যে একটি, যার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো। বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতার লিখিত দলিল এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের বইপত্রে এই রোগের উল্লেখ পাওয়া যায়।
খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৫৫০ সালের Ebers Papyrus মিশরের প্রাচীনতম চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো এবার্স প্যাপিরাস (Ebers Papyrus), যা প্রায় ১৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লেখা হয়েছিল। এই প্যাপিরাসে পাইলসের বর্ণনা এবং এর চিকিৎসার জন্য কিছু নির্দেশনা পাওয়া যায়, যেমন - ডুমুর, মধু ও গাছের পাতা দিয়ে তৈরি মলম ব্যবহারের কথা। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মিশরীয়রা এই রোগ সম্পর্কে অবগত ছিল এবং এর প্রতিকারের চেষ্টা করত।
(২) প্রাচীন গ্রীস
চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস (Hippocrates) যাকে "চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক" বলা হয়, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে পাইলস সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তার লেখায় পাইলসের কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসার বিভিন্ন পদ্ধতি, যেমন - ব্যান্ডিং (শিরা বেঁধে দেওয়া), ছেদ করা (incisions) এবং গরম লোহা দিয়ে দগ্ধ করা (cauterization) ইত্যাদির উল্লেখ রয়েছে। হিপোক্রেটিস বিশ্বাস করতেন যে, এই রোগের চিকিৎসার জন্য জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনা জরুরি।
(৩) প্রাচীন রোম: রোমান চিকিৎসক সেলসাস (Celsus) খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে তার বিখ্যাত চিকিৎসা বিশ্বকোষ "দে মেডিসিনা" (De Medicina)-তে পাইলসের চিকিৎসা সম্পর্কে লিখেছেন। তিনি শিরাগুলো কেটে ফেলার এবং দগ্ধ করার পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেন।
(১) মধ্যযুগীয় ইউরোপ: মধ্যযুগে ইউরোপে পাইলসের চিকিৎসা মূলত প্রাচীন গ্রীক ও রোমান পদ্ধতি অনুসরণ করত। শল্যচিকিৎসকরা প্রায়শই রক্তপাত এবং বাহ্যিক প্রয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসা করতেন। তবে এই সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের তেমন অগ্রগতি হয়নি।
(২) ইসলামী স্বর্ণযুগ: ইসলামী বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা পাইলসের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিখ্যাত পার্সিয়ান চিকিৎসক আভিসেনা (Avicenna), যিনি ১০২৫ খ্রিস্টাব্দে তার "দ্য ক্যানন অফ মেডিসিন" (The Canon of Medicine) গ্রন্থটি রচনা করেন, সেখানে পাইলসের কারণ, লক্ষণ এবং বিভিন্ন চিকিৎসার পদ্ধতি সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। তিনি শল্যচিকিৎসা এবং ভেষজ চিকিৎসার সমন্বয় ব্যবহারের ওপর জোর দেন। এই সময়ে উদ্ভাবিত কিছু যন্ত্র এবং কৌশল পরবর্তীকালে ইউরোপীয় চিকিৎসায় প্রভাব ফেলেছিল।
আঠারো শতক থেকে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে পাইলসের চিকিৎসায়ও নতুন পদ্ধতি যুক্ত হতে থাকে।
(১) ১৯শ এবং ২০শ শতাব্দী: এই সময়ে শল্যচিকিৎসায় নতুন কৌশল এবং যন্ত্রপাতির উদ্ভাবন হয়। বিশেষ করে হেমোরয়েডেক্টমি (Hemorrhoidectomy) বা পাইলস অপসারণের শল্যচিকিৎসা পদ্ধতির উন্নতি হয়। এই সময় স্ক্লেরোথেরাপি (শিরায় রাসায়নিক ইনজেকশন দিয়ে শুকিয়ে দেওয়া) এবং রাবার ব্যান্ড লাইগেশন (রাবার ব্যান্ড দিয়ে পাইলসকে বেঁধে ফেলা) এর মতো অ-শল্যচিকিৎসা পদ্ধতিগুলোও জনপ্রিয় হতে শুরু করে।
(২) একবিংশ শতাব্দী: বর্তমান সময়ে পাইলসের চিকিৎসায় অনেক নতুন এবং কম আক্রমণাত্মক (minimally invasive) পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে।
যেমন - লেজার সার্জারি, ইনফ্রারেড কোয়াগুলেশন এবং হেমোরয়েডাল আর্টারি লাইগেশন (HAL) ইত্যাদি। এছাড়াও, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, যেমন -
পর্যাপ্ত ফাইবার গ্রহণ, জল পান এবং নিয়মিত ব্যায়াম—এই বিষয়গুলোকে পাইলস প্রতিরোধ এবং এর লক্ষণ কমানোর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
পাইলসের ইতিহাস থেকে এটি স্পষ্ট যে, এই রোগটি মানবজাতির জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা এবং যুগে যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এর প্রতিকার খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন।
আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতিগুলো এই রোগের চিকিৎসাকে আরও কার্যকর এবং রোগীর জন্য কম কষ্টকর করে তুলেছে।