যক্ষ্মা (TB) শুধু ফুসফুসের ব্যাধি নয়, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য যে যক্ষ্মা (TB) শুধু ফুসফুসের ব্যাধি নয়। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যক্ষ্মার জীবাণু ফুসফুসকে আক্রমণ করে, কিন্তু এটি শরীরের প্রায় যেকোনো অঙ্গেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফুসফুসের বাইরে যখন যক্ষ্মা হয়, তখন তাকে এক্সট্রাপালমোনারি যক্ষ্মা বলা হয়।
(ক) লসিকাগন্থি (Lymph nodes): গলার,
বগলের বা কুঁচকির লসিকাগন্থি ফুলে যেতে পারে।
(খ) হাড় ও অস্থিসন্ধি (Bones and Joints): মেরুদণ্ড, নিতম্ব, হাঁটু ইত্যাদি
জয়েন্ট বা হাড়ে যক্ষ্মা হতে পারে, যা ব্যথা, ফোলা বা চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। মেরুদণ্ডের
যক্ষ্মাকে 'পটস ডিজিজ'ও বলা হয়।
(গ) মস্তিষ্ক ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (Brain and Central Nervous System):
যক্ষ্মা মস্তিষ্কে বা এর আবরণে (মেনিনজেস) ছড়িয়ে পড়লে মেনিনজাইটিস হতে পারে, যার লক্ষণ
হলো তীব্র মাথাব্যথা, মানসিক পরিবর্তন এবং কোমা।
(ঘ) কিডনি ও মূত্রনালী (Kidneys and Urinary Tract): কিডনি, মূত্রনালী
বা মূত্রাশয়কে আক্রান্ত করলে প্রস্রাবের সমস্যা, ব্যথা বা রক্তপাত হতে পারে।
(ঙ) পেট ও অন্ত্র (Abdomen and Intestines): পেটে ব্যথা, বমি, দীর্ঘস্থায়ী
ডায়রিয়া, পেটে পানি জমা হওয়া বা পেটে চাকা অনুভব হতে পারে।
(চ) ত্বক (Skin): ত্বকে ক্ষত বা ফোঁড়া দেখা যেতে পারে।
(ছ) চোখ (Eyes): চোখের রেটিনা বা অন্যান্য অংশে যক্ষ্মা হলে দৃষ্টি সমস্যা
দেখা দিতে পারে।
(জ) হৃৎপিণ্ড (Heart): বিরল ক্ষেত্রে হৃৎপিণ্ডের আবরণ (পেরিকার্ডিয়াম)
আক্রান্ত হতে পারে, যা হৃৎপিণ্ডের চারপাশে তরল জমতে পারে।
(ক) ফুসফুসের যক্ষ্মা সবচেয়ে বেশি সংক্রামক, কারণ এটি কাশি বা
হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়াতে পারে।
(খ) ফুসফুসের বাইরের যক্ষ্মা সাধারণত সরাসরি ছোঁয়াচে হয় না, তবে আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ
ক্ষমতা দুর্বল হলে বা অন্য কোনো দুর্বল স্থানে জীবাণু সংস্পর্শে এলে ছড়াতে পারে।
(গ) যক্ষ্মার সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, ওজন হ্রাস, ক্ষুধামন্দা, রাতে ঘাম হওয়া এবং
ক্লান্তি। তবে, কোন অঙ্গে যক্ষ্মা হয়েছে তার উপর নির্ভর করে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
(ঘ) যক্ষ্মা নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসার জন্য দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময় মতো
চিকিৎসা না করলে যক্ষ্মা মারাত্মক হতে পারে।
এই বাক্যটি যক্ষ্মার সর্বব্যাপী প্রকৃতিকে নির্দেশ করে। এর মানে হলো, যক্ষ্মার জীবাণু (Mycobacterium tuberculosis) মানবদেহের প্রায় প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেই বাসা বাঁধতে পারে এবং রোগ সৃষ্টি করতে পারে। যদিও ফুসফুস (Pulmonary TB) সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় এবং এটিই সবচেয়ে পরিচিত রূপ, কিন্তু কিডনি, হাড়, মস্তিষ্ক, লসিকাগন্থি, ত্বক, অন্ত্র, চোখ, এমনকি হৃৎপিণ্ড - এরকম প্রায় সব অঙ্গেই যক্ষ্মা হতে পারে। "কারণ যক্ষ্মা হচ্ছে একটি বায়ু বাহিত ব্যাকটেরিয়া জনিত সংক্রামক ব্যাধি, যেটা ‘মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকুলোসিস’ জীবাণুর সংক্রমণে হয়ে থাকে।"
(ক) বায়ু বাহিত (Airborne): যক্ষ্মার জীবাণু সাধারণত
বায়ুর মাধ্যমে ছড়ায়। যখন ফুসফুসের যক্ষ্মা আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি, বা কথা বলেন, তখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণার
(droplets) মাধ্যমে জীবাণু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সুস্থ ব্যক্তি সেই বাতাস গ্রহণ করলে জীবাণু তার শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে।
(খ) ব্যাকটেরিয়া জনিত (Bacterial): যক্ষ্মা একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যা ভাইরাস
বা ছত্রাক দ্বারা হয় না। এর জন্য দায়ী নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া হলো Mycobacterium tuberculosis।
(গ) সংক্রামক ব্যাধি (Infectious Disease): এটি একজন থেকে অন্যজনে ছড়াতে পারে,
বিশেষ করে ফুসফুসের যক্ষ্মার ক্ষেত্রে।
এই বাক্যটি আগের আলোচনারই পুনরাবৃত্তি এবং জোর দেয় যে, একবার জীবাণু মানবদেহে প্রবেশ করলে, এটি রক্তপ্রবাহ বা লসিকাতন্ত্রের মাধ্যমে শরীরের যেকোনো অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সেখানে রোগ সৃষ্টি করতে পারে। ফুসফুসের বাইরে যখন যক্ষ্মা হয়, তখন তাকে এক্সট্রাপালমোনারি যক্ষ্মা (Extrapulmonary TB) বলা হয়। সংক্ষেপে, যক্ষ্মার রোগতত্ত্ব (epidemiology) এবং প্যাথোফিজিওলজি (pathophysiology) সম্পর্কে একটি চমৎকার সারসংক্ষেপ প্রদান করে। এটি রোগের বহুমুখী প্রভাব এবং এর কারণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করে।